
মো. হাসান ভূঁইয়া, মাধবপুর (হবিগঞ্জ): 'সরকার বদলায়, কিন্তু অবহেলিত প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।' হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ এক যুগের বঞ্চনা আর আর্তনাদের চিত্র এটি। 'হবে-হচ্ছে' আশ্বাসের চক্করে পড়ে থাকা প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতু দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় দীর্ঘ এক যুগ ধরে সম্পূর্ণ অকেজো পড়ে রয়েছে।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার হরষপুর রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন এই সেতুটি দিয়ে আজ পর্যন্ত একটি গাড়ি বা সাধারণ মানুষও চলাচল করতে পারেনি। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেট রুটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরষপুর স্টেশনে যাতায়াতকারী দুটি জেলার অন্তত ১০টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষকে প্রতিদিন চরম ঝুঁকি ও সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
রাজনৈতিক বৈষম্য, দীর্ঘসূত্রিতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি এখন এলাকাবাসীর গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে হরষপুর থেকে কাশিমনগর পর্যন্ত আধা-পাকা রাস্তার কাজ শুরু হয় এবং পরবর্তীতে ২০১৪ সালে আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে হাসিনাবাদ-জামালপুর সংযোগ সেতুটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু মূল সেতু দাঁড়িয়ে থাকলেও দুই পাশে সংযোগ সড়ক বা মাটি ভরাটের ব্যবস্থা করা হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য মাটি ভরাট করলেই এই সেতুটি চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব নয়; কারণ সামান্য পানিতেই সেই মাটি ধুয়ে ভেঙে যাবে। সংযোগ সড়ক স্থায়ী করতে হলে বড় ধরনের আর্থিক বাজেট এবং টেকসই প্রকৌশল কাজের প্রয়োজন। কিন্তু বিশাল এই বাজেটের অজুহাতে এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অবহেলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বারবার কাজ শুরু করতে পিছপা হয়েছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতা জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া অভিযোগ করে বলেন, "চৌমুহনী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির ঘাঁটি—এ কারণেই গত ১৭ বছর এই ওয়ার্ডের কোনো ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়নি। দীর্ঘ এই বঞ্চনা ও দুর্ভোগ নিরসনে আমরা সম্প্রতি মাননীয় সংসদ সদস্যের কাছে গিয়েছিলাম এবং এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি তাকে অবহিত করেছি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।"
সংযোগ সেতুর অভাবে হরষপুর ও কাশিমনগর এলাকার মানুষকে প্রয়োজনের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এর ফলে গত এক যুগে যাতায়াত ও পরিবহন বাবদ এলাকার সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অতিরিক্ত বড় অঙ্কের অর্থ অপচয় হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই রুটে প্রতিদিন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার হাজার হাজার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেলের স্লিপার ও কাঠের ওপর দিয়ে চলাচল করেন। বর্ষাকালে নালায় পানি বৃদ্ধি পেলে বা স্বাভাবিক সময়েও বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় এই পথ ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। প্রায় ১০০ ফুট লম্বা এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় হঠাৎ ট্রেন চলে এলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।
প্রতিদিন আসা-যাওয়ার পথে এই বেহাল সেতুটি দেখলেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। সেতুটির এমন অপচয় ও দুর্ভোগ দেখে যাতায়াতের সময় ক্ষুব্ধ পথচারী ও এলাকাবাসী তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ভুক্তভোগী স্থানীয়রা জানান, সরকারি টাকা খরচ করে ব্রিজ বানানো হলেও ওঠার রাস্তা না থাকায় এটি এখন গলার কাঁটায় রূপ নিয়েছে। অসুস্থ রোগী বা গর্ভবতী নারীদের নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার সময় তাদের কষ্টের সীমা থাকে না।
এ বিষয়ে দীর্ঘসূত্রিতার কথা স্বীকার করে মাধবপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো: শামস জাবেদ বলেন, "বিভিন্ন সময় সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। সেতুটি চালুর জন্য পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা)-এর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।"
স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক বা কারিগরি জটিলতার অজুহাত দেখিয়ে আর কালক্ষেপণ না করে, দ্রুত বড় বরাদ্দ নিশ্চিত করে সংযোগ সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে সেতুটি চালুর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুক বর্তমান প্রশাসন।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা