
যায়যায়কাল ডেস্ক: ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার।
একইসঙ্গে এই সংঘাতের প্রভাবে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
যদিও মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে তার নীতিগুলো কাজ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতির বর্তমান ঊর্ধ্বগতি কেবল সাময়িক।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের মূল্যস্ফীতি শুধু স্বল্পমেয়াদি।’ ট্রাম্প আরও পূর্বাভাস দেন যে, এটি বর্তমান ৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসবে।
তার ভাষায়, ‘এই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেই—যা বেশি সময় নেবে না—তেলের দাম কমে যেতে দেখবেন।’
যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে নতুন হিসাব
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের ব্যয় ক্রমাগত হালনাগাদ করা হচ্ছে। পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার জে হার্স্ট মার্কিন কংগ্রেসের এক শুনানিতে বলেন, শুরুতে এই ব্যয়ের আনুমানিক হিসাব ছিল ২৫ বিলিয়ন ডলার, তবে নতুন তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তা এখন বেড়ে ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
হার্স্ট জানান, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের মূল কারণ হলো সামরিক সরঞ্জাম মেরামত ও প্রতিস্থাপনের খরচ বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের মোতায়েন ও অভিযান পরিচালনার সাধারণ ব্যয় বেড়ে যাওয়া।
তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন যে, এই ২৯ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তার ভাষায়, ‘এই মুহূর্তে আমাদের কাছে ক্ষয়ক্ষতির নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই।’
এর আগে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কংগ্রেসে দেওয়া প্রাথমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাব প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় কম ছিল। একাধিক সূত্রের বরাতে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, যদি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি এবং ধ্বংস হওয়া সামরিক সম্পদের প্রতিস্থাপন খরচ ধরা হয়, তাহলে প্রকৃত ব্যয় ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হতে পারে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য জানিয়েছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী কংগ্রেসকে তথ্য দেওয়া হবে, তবে সব তথ্য প্রকাশের সময় ও পদ্ধতি নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর।
মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ
রয়টার্স বলছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি সরাসরি মার্কিন অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। নতুন অর্থনৈতিক তথ্যে দেখা গেছে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা টানা দ্বিতীয় মাসে উচ্চ প্রবৃদ্ধি। মার্চ মাসে এই বৃদ্ধি ছিল শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। এর ফলে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা এবং খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এই মূল্যস্ফীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় প্রভাব
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে। মার্চ মাসে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
যদিও এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতির পর দাম কিছুটা কমে, তবে তা এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে।
শ্রম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে জ্বালানির দাম ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে, যা মোট মূল্যস্ফীতির ৪০ শতাংশেরও বেশি অংশ তৈরি করেছে। মার্চ মাসে জ্বালানির দাম বেড়েছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।
এর মধ্যে গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, ফুয়েল অয়েলের দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দামও বেড়েছে।
খাদ্যপণ্যের দামেও চাপ
শুধু জ্বালানি নয়, খাদ্যপণ্যের বাজারেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এপ্রিল মাসে খাদ্যপণ্যের দাম শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে মুদি দোকানের পণ্যের দাম শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গরুর মাংসের দাম ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে, ফল ও সবজির দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং নন-অ্যালকোহলিক পানীয়ের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ। দুধ, ডিম এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
নেভি ফেডারেল ক্রেডিট ইউনিয়নের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিদার লং বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে একটি ‘আর্থিক চাপ’ চলছে। তার মতে, তিন বছরের মধ্যে এই প্রথম মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন বাস্তব অর্থনৈতিক চাপ অনুভব করছে। মূল্যস্ফীতি তাদের আয়ের সব বৃদ্ধি শুষে নিচ্ছে।’
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। আরএসএমের প্রধান অর্থনীতিবিদ জোসেফ ব্রুসুয়েলাস বলেন, বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই চাপের মুখে রয়েছে। তার মতে, জ্বালানি, পরিবহন এবং খাদ্যের দাম আগামী মাসগুলোতে আরও বাড়তে পারে।
এদিকে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারকদের ওপরও চাপ বাড়ছে। শক্তিশালী শ্রমবাজার এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, এমনকি ২০২৭ সাল পর্যন্তও তা স্থায়ী হতে পারে।
একসঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ
একদিকে যুদ্ধের কারণে মার্কিন সরকারের সামরিক ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ জনগণ মূল্যস্ফীতির চাপে নাভিশ্বাস অবস্থায় রয়েছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনেও চাপ বাড়ছে, কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি সংকট সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ এখন শুধু সামরিক সংঘাত নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে, যার পরিণতি আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা