

আবিদ হাসান, হরিরামপুর(মানিকগঞ্জ) : একটা সময় পদ্মানদী ছিলো ভয়ংকর। মুহূর্তেই তছনছ করে দিত মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকা। অসহায় মানুষের ঠাঁই নেয়ার মতো জায়গা পেত না রাস্তা কিংবা অন্যের জমিতে।
শতশত বিঘা জমি,বাড়িঘড়, সরকারি-বেসরকারি স্হাপনা, গাছপালা নিমিষেই পদ্মার কড়াল গ্রাসে চলে যেত। পদ্মাভাঙন থামাও হরিরামপুর বাঁচাও এর ব্যানারে শত শত তরুণরা আন্দোলনে নেমেছিল সেই সময়টা। এ যেন পদ্মার মহাতাণ্ডব কোনো কিছুতেই ফিরবে না পদ্মানদীর ভাঙন।
এখন আর পদ্মায় তেমন ভয়াবহ ভাঙন নেই। অনেকের কাছে পদ্মা ছিলো অভিশাপের নাম, আর এখন হয়েছে প্রিয় পদ্মানদী। নদী যেন পুরো শাসনে চলে এসেছে। পদ্মাপাড়ের অসহায় মানুষগুলো এখন শান্তিতে ঘুমাতে পারে। প্রতি বর্ষায় উপজেলার নদী তীরবর্তি কিছু এলাকায় ভাঙন দেখা দিলেও সাথে সাথে ভাঙন রোধের জন্য জিও ব্যাগ,জিও টিউব দিয়ে ভাঙন রোধ করা হয়। এ যেন আলাদিনের আশ্চর্য্য প্রদিপের মতই মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড।
বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা আর মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর চ্যালেঞ্জে অভিশপ্ত পদ্মানদী এখন সবার প্রিয়। ইচ্ছে হলেই ভ্রমণ পিপাসুরা প্রতিদিন পদ্মানদীকে দেখতে এসে আনন্দ উপভোগ করে।
হরিরামপুর উপজেলার নদী তীরবর্তি এলাকার মানুষদের সাথে কথা বলে জানা গেছে- মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড আর নির্বাহি প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিনকে না চিনেও ধন্যবাদ আর দোয়া করেন অনেকেই। এত দ্রুত কাজ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড, এটা নদী তীরবর্তি মানুষের ধারণার বাইরে ছিলো।
নদী তীরবর্তী বসতি মাসুদ, ইউসুব, মুন্নাফ, আব্দুল হক, বাতেন, রবিউলসহ অসংখ্য মানুষেরা মোবাইল ফোনে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙনের কথা অবহিত করার পর পরই সাথে সাথে ভাঙন কবলিত স্থানে কাজ হয় বলে জানান এলাকার বেশ কিছু সাধারণ মানুষ।
আর হরিরামপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্য-সহকারী মো. ইকবাল হোসেন দিনে রাতে যখনই ডাকা হয়ছে, তখনই এর দ্রুত গতির কাজের জন্য আমরা সুফল পেয়েছি বলেও জানা গেছে। এসব গুণী মানুষদের ধন্যবাদ আর শুভ কামনা না জানালে আমাদের দায় মুক্তি হবে না বলেও জানান এলাকার সাধারণ মানুষ।
এখন এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি, মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকতে যেন স্থায়ী একটা টেকসই বাধ হয়। সেজন্য সরকার তথা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে আকুল আবেদন জানান স্থানীয় পদ্মাপাড়ের জনগণ।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহি প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিনের সাথে একান্ত আলাপকালে জানা গেছে, মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে প্রমত্তা পদ্মা নদী। যেটাকে আমাজন নদীর পর পৃথিবীর ২য় খরস্রোতা নদী বলা হয়। প্রায় ২৫ কিলোমিটার পদ্মা নদী হরিরামপুর উপজেলার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বিগত ৫০ বছরে অত্র উপজেলার অনেক ভুখন্ড পদ্মা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। সে প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক "Flood and River Bank Erosion Risk Management Investment Program (Phase-1)" প্রকল্পের মাধ্যমে হরিরামপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর হতে হারুকান্দি পর্যন্ত অংশে জিও-ব্যাগের মাধ্যমে ৮.৮০০ কিলোমিটার অংশে ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীতীর রক্ষা কাজ বাস্তবায়িত হয়।
তিনি আরও জানান, ফলে আন্দারমানিক বাজার, হরিরামপুর থানা, হরিরামপুর উপজেলা হেডকোয়ার্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীভাঙন হতে রক্ষা পায়। কিন্তু এরপরও হরিরামপুর উপজেলার আরও ১৭ কিলোমিটার নদী তীর অরক্ষিত থেকে যায়। যার ফলে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০২২ সালে ধুলসুড়া এলাকায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১.২০০ কিলোমিটার এবং গোপীনাথপুর এলাকায় ১.০০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়ন করে।
পরবর্তীতে ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে "Flood and River Bank Erosion Risk Management Investment Program (Phase-2)" প্রকল্পের আওতায় গোপীনাথপুর হতে রামকৃষ্ণপুর পর্যন্ত ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক হারুকান্দি হতে ধুলসুরা পর্যন্ত ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩.৫০০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ বাস্তবায়িত করে। এছাড়াও ২০২২ এবং ২০২৩ সালে জরুরী আপদকালীন কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাঞ্চনপুর এলাকায় প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকায় নদী তীর রক্ষা কাজ বাস্তবায়িত হয়। বর্তমানে কাঞ্চনপুর হতে মালুচি পর্যন্ত অংশে হরিরামপুর উপজেলার প্রায় ১.৫০০ কিলোমিটার অংশ অরক্ষিত অবস্থায় আছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, প্রস্তাবিত "Flood and River Bank Erosion Risk Management Investment Program (Phase-3)" প্রকল্পের আওতায় কাঞ্চনপুর হতে মালুচি পর্যন্ত অংশে ১.৫০০ কিলোমিটার, ইতিপূর্বে ২০১৬ এবং ২০২৩-২৪ সালে বাস্তবায়িত নদীতীর রক্ষা কাজগুলি আরও শক্তিশালীকরণ এবং হরিরামপুর উপজেলায় প্রায় ১৪.০০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বর্তমানে অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন আছে।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয় বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন জানান, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক, এমপি মানিকগঞ্জ জেলাকে নদীভাঙন হতে রক্ষা করার বিষয়টিকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে বিগত সময়ে অত্র জেলার হরিরামপুর উপজেলায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
তিনি আরও জানান, বন্যাকালীন সময়ে পদ্মা নদী অনেক ভয়ংকর আকার ধারণ করে। তাই এই সময়ে কোথাও ভাঙন দেখা দিলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে দ্রুততম সময়ে তা মেরামত করে দেয়া হবে। বর্তমানে আন্দারমানিক ঘাট সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০০ মিটার অংশে জরুরি ভিত্তিতে জিও-ব্যাগ ডাম্পিং কাজ চলছে।
এছাড়া ২/৩ দিনের মধ্যে কাঞ্চনপুর এলাকায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫০ মিটার অংশে জিও-ব্যাগ ডাম্পিং কাজ শুরু করা হবে। মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগ কর্তৃক এলাকাগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। এছাড়াও কোথাও ভাঙন দেখা দিলে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগকে অবহিত করার জন্য তিনি অনুরোধ করেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা