
যায়যায়কাল ডেস্ক: গভীর রাত। আবাসিক হোটেলের কক্ষগুলোতে তখন নীরবতা। ঘুমিয়ে ছিলেন অতিথিরা। হঠাৎ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ভারতের কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আগুন ও ঘন ধোঁয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে।
এ ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৭ বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ছয়জন। তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হোটেলের মালিককে পুলিশ এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে জমির মালিককে আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে কলকাতার বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবন ও হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে হোটেলটির বৈধ কাগজপত্র, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে হোটেলটিতে ঠিক কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। প্রাথমিক তদন্তে শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিহতদের মধ্যে ৭ বাংলাদেশি নাগরিক
নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে কুষ্টিয়ার একটি পরিবারের চারজন রয়েছেন বলে জানা গেছে। তারা হলেন দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন, ছেলে শর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম হোসেন। চিকিৎসার জন্য তারা কয়েক দিন আগে ভারতে গিয়েছিলেন।
এ ছাড়া ঢাকার সাভারের আহমেদ বাবু এবং সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের এসএম আলিমুজ্জামান ও রেবতী সরকারও নিহতদের তালিকায় রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে নিহতদের মধ্যে ঝাড়খণ্ডের হোটেলকর্মী সন্দীপ পাশওয়ান এবং পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির যোগনারায়ণ আগরওয়ালও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে নিহতদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে চূড়ান্ত সরকারি তালিকা প্রকাশের পর তথ্যটি নিশ্চিত করা হবে।
সরু প্রবেশপথ, নেই জরুরি বহির্গমন পথ
বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, হোটেলটির প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আশপাশে পুলিশ সদস্য ও সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, অগ্নিকাণ্ডের সময় হোটেলের ওপরের তলা থেকে সাহায্যের জন্য চিৎকার শোনা যায়। কিন্তু ঘন ধোঁয়ার কারণে অনেকেই আতঙ্কে ভবন থেকে বের হতে পারেননি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে হোটেলটির সরু প্রবেশপথ ও পুরোনো লোহার সিঁড়ি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভবনটিতে পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ছিল না বলেও জানা গেছে। ফায়ার এক্সিটের ঘাটতি এবং সংকীর্ণ সিঁড়ির কারণে আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে অতিথিদের বেরিয়ে আসতে সমস্যা হয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
হোটেলটির পেছনের অংশেও অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ভবনের পেছনে একটি বড় এয়ারকন্ডিশনার ইউনিট ও আশপাশের দেয়ালে আগুন ও ধোঁয়ার চিহ্ন দেখা যায়।
একই চত্বরে আরও কয়েকটি হোটেল রয়েছে। সেগুলোর বৈধ কাগজপত্র ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে।
‘কীভাবে অনুমতি পেল এসব হোটেল?’
ঘটনার পর কলকাতার ঘিঞ্জি এলাকায় পরিচালিত হোটেলগুলোর অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পশ্চিমবঙ্গের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল প্রশ্ন তুলেছেন, এসব হোটেল কীভাবে ট্রেড লাইসেন্স, বিদ্যুৎ সংযোগ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেয়েছে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি তদন্তের কথা জানিয়েছেন।
দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরীও কলকাতার ঘিঞ্জি এলাকায় থাকা হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এ ধরনের হোটেলগুলোর ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে।
অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন
কলকাতার নিউমার্কেট ও মির্জা গালিব স্ট্রিট এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য ছোট হোটেল, লজ ও গেস্টহাউস পরিচালিত হয়ে আসছে। চিকিৎসা, ব্যবসা ও ভ্রমণের কাজে কলকাতায় আসা বাংলাদেশি এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মানুষ এসব আবাসিক হোটেলে অবস্থান করেন।
মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশ্ন উঠেছে—যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ ও বৈধ অনুমোদন ছাড়া কীভাবে এসব হোটেল পরিচালিত হচ্ছিল?
অগ্নিকাণ্ডের কারণ এবং হোটেলটির অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয়ে তদন্ত শেষ হলে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা