
আশরাফ উদ্দিন, দিরাই (সুনামগঞ্জ): সুনামগঞ্জে হাওরবেষ্টিত দিরাই ও আশপাশ এলাকার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র সরকারি ভরসা দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন চিকিৎসক, জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সংকটে কার্যত বিপর্যস্ত।
চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানের ঘাটতি, অচল চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, পরিচ্ছন্নতার সংকট এবং প্রসূতি সেবার দুর্বলতায় প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগে পড়ছেন রোগীরা।
২০১৭ সালে হাসপাতালটি ২০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। সম্প্রতি এটিকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার প্রজ্ঞাপন জারি হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত না হওয়ায় সাধারণ মানুষ এর সুফল পাচ্ছেন না। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি কেবল ‘কাগজে উন্নয়ন’।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, পুরো দিরাই উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনার জন্য অনুমোদিত ৮৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৫ জন। অর্থাৎ ৪৯টি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। চিকিৎসকের ৪৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র সাতজন।
এদিকে উপজেলার রফিনগর, ভাটিপাড়া, করিমপুর, জগদল, তাড়ল ও কুলঞ্জ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ভাটিপাড়া ও পেরুয়া উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র—মোট আটটি উপকেন্দ্রের একটিতেও কোনো চিকিৎসক নেই। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। যেখানে ১০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকার কথা, সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। ফলে ওয়ার্ড, করিডোর ও বাথরুমের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে দুর্গন্ধ, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গর্ভবতী নারী ও প্রসূতিরা। প্রয়োজনীয় গাইনি বিশেষজ্ঞ এবং জরুরি প্রসূতি সেবার অভাবে অনেক রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে জরুরি মুহূর্তে রোগী ও স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জনবল সংকটের কারণে জরুরি বিভাগে অনেক সময় ডিএমএফ ইন্টার্নদের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। জটিল রোগী এলে চিকিৎসক বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না থাকায় তাদের সিলেটে রেফার করা হচ্ছে। ল্যাব ও এক্স-রেসহ কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে সেগুলোর অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে রয়েছে। এতে রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অতিরিক্ত খরচে পরীক্ষা করাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে রোগীরা চিকিৎসকের অপেক্ষায় থাকলেও অনেক সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের পাওয়া যায় না। এতে রোগীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
জগদল গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল বলেন, “হাসপাতালে এসে অনেক সময় কোনো ডাক্তার পাওয়া যায় না। রোগীরা কষ্ট পেলেও দেখার কেউ থাকে না। গরিব মানুষ সরকারি হাসপাতালে সেবা না পেলে কোথায় যাবে?”
কুলঞ্জ ইউনিয়নের শাব্বির আহমেদ ও সায়েল মিয়া বলেন, “হাসপাতালের পরিবেশ খুবই নোংরা। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই, বাথরুম ব্যবহার করা যায় না। রোগীদের যে খাবার দেওয়া হয়, তার মানও খুব খারাপ।”
হাসপাতালের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আফজাল হোসেন বলেন, “১০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর স্থলে মাত্র একজন কাজ করছেন। এই জনবল দিয়ে পুরো হাসপাতাল পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী ইনামুল হক চৌধুরী বলেন, “হাসপাতালটি ১০১ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পথে। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল না থাকলে শুধু শয্যা বাড়িয়ে কোনো সুফল মিলবে না।”
আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. দেবাশীষ রায় বলেন, “চিকিৎসক ও জনবল সংকট অত্যন্ত প্রকট। মাত্র সাতজন চিকিৎসক দিয়ে পুরো উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলা বা প্রাইভেট প্র্যাকটিসের কারণে সরকারি সেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জগদল ২০ শয্যা হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জনবল ও কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, হাওরাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে শুধু শয্যা বৃদ্ধি নয়, জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ, অচল যন্ত্রপাতি চালু এবং হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা