

যায়যায়কাল প্রতিবেদক: রাজধানীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রোববার থেকে ছয়টি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এসব রুটে ৭৮০টি বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি রুটে চলবে শুধু নন-এসি বাস। বাকি দুটি রুটে থাকবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) ও নন-এসি বাস।
রোববার বেলা ১১টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) উদ্যোগে বাস্তবায়িত এ কার্যক্রমে শুরুতে পুরোনো বাসই ব্যবহার করা হচ্ছে। বাসগুলো রং করে নতুন ব্যবস্থায় নামানো হচ্ছে। ছয়টি কোম্পানিকে এসব বাস পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে পরিবহন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পুরোনো বাস ও বিদ্যমান কোম্পানিগুলোকে নিয়ে এভাবে কার্যক্রম শুরু করলেই প্রকৃত অর্থে বাস রুট রেশনালাইজেশন সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়ব্যবস্থা, আধুনিক ও বিশেষায়িত বাস এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা।
গত ৮ অক্টোবরের এক বৈঠকে রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ছয় মাসের মধ্যে বাস রুট রেশনালাইজেশন বা ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ওই বৈঠকে ডিটিসিএর পক্ষ থেকে একটি পরিকল্পনাও উপস্থাপন করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীর বিদ্যমান ৯৮টি বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টিতে নামিয়ে আনার কথা রয়েছে। প্রতিটি রুটে একটি কোম্পানির অধীনে বাস চলাচল করবে। নির্ধারিত স্টপেজ, কাউন্টারভিত্তিক টিকিট, ই-টিকিটিং ও জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে বাস চলাচল।
তবে পূর্ণাঙ্গ ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থা চালুর আগে আপাতত পুরোনো বাস দিয়েই ছয়টি রুটে কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে ডিটিসিএ।
সংস্থাটির অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শুরুতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একটি রুটে একটি কোম্পানির বাস চলবে—প্রাথমিকভাবে এটি নিশ্চিত করা হচ্ছে। শুরুতেই বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির পুরো ধারণা বাস্তবায়ন সম্ভব না হলেও এ উদ্যোগের মাধ্যমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পর্যায়ক্রমে পুরো ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে। বাসমালিকেরা কীভাবে শৃঙ্খলা বজায় রাখেন, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপর স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার রুটে ২৫৩টি নন-এসি বাস পরিচালনা করবে ভিআইপি পরিবহন বাস কোম্পানি। দীর্ঘদিন ধরেই এ পথে কোম্পানিটির বাস চলাচল করছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে এ পথে গোলাপি রঙের বাস চালু করা হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগেও কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফেরেনি।
মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত ১৭ দশমিক ১৮ কিলোমিটার রুটে ১৩৩টি বাস পরিচালনা করবে চিড়িয়াখানা সিটি বাস কোম্পানি। অন্যদিকে, কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে ডেমরা পর্যন্ত ২৪ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার রুটে ৭০টি বাস চালানোর দায়িত্ব পেয়েছে রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ। এ দুটি কোম্পানির বাসও বর্তমানে ঢাকার সড়কে চলাচল করছে।
এ ছাড়া ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত ২৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার রুটে ১৫০টি বাস পরিচালনা করবে ফোর স্টার বাস লাইন। ঘাটারচর থেকে উত্তরা পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার রুটে ১৯০টি বাস চালাবে পিএনপি সিটি সার্ভিস।
অন্যদিকে, টঙ্গী থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত ২২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার রুটে ২০টি এসি বাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ রুট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কোম্পানি হিসেবে ‘ঢাকা চাকা’র নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এসব রুটের কয়েকটিতে বর্তমানে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল করছে। এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে ভিআইপি, বিকাশ, দিশারী, তানজিল, মেট্রোলিংক, রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ, রজনীগন্ধা, মালঞ্চ, সময়, মিডলাইন, পরিস্থান ও প্রজাপতি পরিবহন।
নতুন ব্যবস্থায় নির্ধারিত কোম্পানির বাইরে অন্য কোম্পানির বাস চলাচল বন্ধ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে এসব রুটে একাধিক কোম্পানির বাস চলাচল করে আসছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, পুরোনো বাস ও বিদ্যমান মালিকদের একটি রুটের আওতায় এনে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে নতুন বাস আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে দ্রুত নতুন বাস যুক্ত করে সেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।
রাজধানীতে বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্যোগ শুরু হয় ২০১৫ সালে। ওই সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক এ উদ্যোগ নেন। পরিকল্পনা ছিল, রাজধানীর বাস চলাচলকে আটটি রুটে ভাগ করে প্রতিটি রুটে নির্দিষ্ট রঙের বাস চালু করা হবে। তবে ২০১৭ সালে আনিসুল হকের মৃত্যুর পর উদ্যোগটি আর এগোয়নি।
পরবর্তী সময়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বে বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটি নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২০২১ সালে ২৪৬টি পরিবহন কোম্পানিকে একীভূত করে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২৭৮টি রুট পুনর্বিন্যাস করে ২২টি রুট নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়।
ওই বছরের ডিসেম্বরে ঘাটারচর থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ২৬ নম্বর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় ঢাকা নগর পরিবহনের বাস। এ ব্যবস্থায় কাউন্টারভিত্তিক টিকিট এবং নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু একই পথে চলাচলকারী অন্য কোম্পানির বাসগুলোকে এ ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। ফলে পরীক্ষামূলক সেবাটি একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যাত্রীছাউনিগুলোও পরে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাস রুট রেশনালাইজেশনের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাসব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাসমালিকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাড়া পাওয়া যায়নি।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে একাধিক বৈঠক করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ছয় মাসের মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাসব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
তবে পুরোনো বাস ও বিদ্যমান কোম্পানিগুলোকে নিয়ে নতুন করে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে রুট নিয়ন্ত্রণ, বাসের মান, ভাড়া আদায়ব্যবস্থা এবং পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ের ওপর। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা