

লেখক:এম.এ.জলিল রানা,জয়পুরহাট প্রতিনিধি : বিজয়ের মাস ডিসেম্বর, বাঙালি জাতির জন্য এটি একটি অবিস্মরণীয় ও সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনাবহুল মাস। ১ ডিসেম্বর থেকে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে একাত্তরের চেতনায় দেশপ্রেম বেড়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানোর ব্যথাকে ভুলে গিয়ে সবাই মনে মনে এ মাসকে স্বাগত জানান। এক কথায় বলতে গেলে ডিসেম্বর মনেই বাঙালি জাতির ত্যাগ-অর্জন ও বিজয়ের মাস।
এই মহান বিজয় যারা এনে দিয়েছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিজয় মাসের প্রথম দিনটিকে মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেয়া হয় কয়েক বছর আগে। আর এই উদ্যোগ নেন এ দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ । ১ ডিসেম্বর থেকেই দেশে শুরু হয় বহুমাত্রিক কর্মসূচি। রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বলেও পালিত হয় মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নানান কর্মসুচি।
’১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে,লাল সবুজের পতাকা পেয়েছি আমরা কিন্তু এই একাত্তর হঠাৎ করে আসেনি। সহজেই কোনোকিছুই হয়নি। দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন, সংগ্রামের দূর্গম পথ পেড়িয়ে এমন একপর্যায় এসেছিল, যেটি ছিল ঐ আন্দোলন-সংগ্রামের প্রানান্তকর প্রচেষ্টার চূড়ান্ত পর্যায়। আর সেটিই হলো একাত্তর।
১৯৪৭ সালে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর শুরু হয় পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ আর নির্যাতন। ক্রমবর্ধমান হারে চলতে থাকে বৈষম্য। পূর্ব পাকিস্তান ধীরে ধীরে পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের জন্য শুধু মাত্র কাঁচামালের যোগানদাতা একটি কলোনি বা উপনিবেশে পরিণত হয়।
কোনো জাতি বা গোষ্ঠিকে ধ্বংস করতে হলে প্রথম তার ভাষাকে ধ্বংস করতে হয়। আর এই তাত্ত্বিকতায় বিশ্বাসী হয়েই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির ভাষার উপর হাত দেয়। পর্যায় ক্রমে পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও খাজা নাজিম উদ্দীন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। ঘোষণার পর পরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন বাঙালি জনতা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জনতা ভাষার জন্য জীবনদানের বিরল ইতিহাস রচনা করেন, যার মধ্যে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ সুপ্ত ছিল।
শুধু ভাষাই নয়, বৈষম্য ছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, প্রশাসনিক, চাকরি ও সামরিক ক্ষেত্রেও। পূর্ব পাকিস্তানের এই অসহায় অবস্থা ও বৈষম্য থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অবস্থিত তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি পেশ করেন, যা ছিল বাঙালি জাতির বাঁচার দাবি।
কিন্তু এ ৬ দফা তৎকালীন স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পক্ষে মেনে নেয়া কখনোই সম্ভব ছিল না। তাই শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করলে তাকে ও আ: লীগকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এবং পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ করার হীন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেন। ছাত্র জনতা এ মামলাকে পিন্ডি ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করে। আর এই মামলার ফলে ৬ দফা সত্যিকারের গণদাবিতে রূপান্তরিত হয় আর মামলাও মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়।
এরপর ১৯৬৯ সালে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ পূর্ব বাংলার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দীদের মুক্তির দাবিতে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। বস্তুত প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের গণবিরোধী সব কর্মকাণ্ড ও সামরিক স্বৈরাচারের অবসান এবং অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আ: লীগের ৬ দফা ও ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানে পরিচালিত তীব্র গণআন্দোলনই ছিল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। তৎকালীন সরকার এ আন্দোলন নস্যাৎ করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। এ আন্দোলনে ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামান নিহত হলেও এখানেই শেষ নয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহরুল হককে বন্দী অবস্থায় ক্যান্টনমেন্টে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি নির্মমভাবে হত্যা করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে ।
এসব ঘটনায় দেশের পরিস্থিতি চরম খারাপের দিকে ধাপিত হয়। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব সরকার আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতির তীব্রতা ও বেগতিক লক্ষ করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিকট ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।গণআন্দোলনে ফলে দীর্ঘ ১০ বছরের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে ।
জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন। এর প্রেক্ষিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে আ: লীগ ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আ:লীগ মোট ৩১০টি আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন।
১৯৭০ এর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে বাঙালির এমন গৌরবোজ্জ্বল নেতৃত্বকে ক্ষমতা দিতে পাকিস্তানি সরকার বৈধভাবে বাধ্য ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করেন। ফলে ১৯৭১ সালের শুরু থেকেই আরম্ভ হয় ষড়যন্ত্রের জাল বোনা। যাতে করে পুরো বাংলাদেশ আটকে থাকে। শুধু তাই নয়, এই সংগ্রামের আকর্ষণীয় নেতৃত্বকেও কোণঠাসা করার চেষ্টা চালায়।
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের তারিখ নির্ধারণ করেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের মসনদে বসতে দেয়া যাবে না। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ তাই ইয়াহিয়া খান হঠাৎ করে ঘোষণা করেন ৩ মার্চের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত থাকবে। এখান থেকেই মূলত বাঙালির সংগ্রাম শুরু। শেষ অবধি, পূর্ণাঙ্গ অধিকার দিতে অস্বীকৃতি জানালে মার্চ মাসে শুরু হয় প্রতিরোধ, আন্দোলন, সংগ্রামী পথযাত্রা, আর এই যাত্রা শুরু হয় ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে। ৭ মার্চের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত হয়।
অপারেশন সার্চলাইটের নীল নকশা অনুযায়ী ৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সংঘটিত হয় বিশ্বের ইতিহাসের বিরল গণহত্যা। পরবর্তী সময়ে শুরু হয় বাঙালির প্রতিবাদ, সুদীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ৭১ এর ১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পদে পদে মার খেয়ে পাকসেনারা পালাতে শুরু করে। দেশব্যাপী ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জয় জয়কার ধ্বনি। অবশেষে অর্জিত হয় কাঙ্ক্ষিত মহান বিজয়।
বিজয়ের ঠিক দুদিন আগে অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর জাতিয় জীবণে জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত বেদনাবিধুর একটি দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় যখন সুনিশ্চিত, ঠিক তখনই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসররা ১৪ ডিসেম্বর রাতের আঁধারে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বরেণ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের নির্মমভাবে হত্যা করে। এর পর দেশকে মেধাশূন্য করার অপচেষ্টা হিসেবে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা হাতে নেয় পাকবাহিনী। এ হত্যাকাণ্ড ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম এক বর্বর নারকীয় ঘটনা; যা স্তম্ভিত করেছিল বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে । এ দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্ব ও যথাযখ মর্যাদায় পালন করে বাংলাদেশ।
আমাদের জাতীয় জীবনবোধে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ইংরেজি বছরের শেষ মাসটির তেমন গুরুত্ব ছিল না। পরের বছর ১৯৭১ সাল থেকেই এর সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে যায় বাংলাদেশের নামটি। ১৯৭১ সালে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ডিসেম্বরেই বাংলার জমিনে মুক্ত আকাশে মুক্তির নিশান ওড়ে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বর ফিরে এলেই দেশব্যাপী ছেয়ে যায় লাল-সবুজের পতাকায়। ভাষাকে কেন্দ্র করে যে জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছিল, এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিজয়ের মাধ্যদিয়ে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে।
পবিত্র এই অবিস্মরণীয় অধ্যায়টি নিয়ে আমাদের যেন বিতর্কের ইয়াত্বা নেই। আজ পর্যন্ত সর্বজন স্বীকৃত ও অবিকৃত মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি ইতিহাস রচনা করা হয়নি। যে কারণে ৭১ পরবর্তী সময়ে জন্ম নেয়া আজকের সচেতন প্রতিটি তরুণের বুকে সঠিক ইতিহাস না জানার হাহাকার খুবি শ্পষ্ট। এমন বিবাদমান পরিস্থিতিতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এদেশে জটিল ও কূটকৌশলী রাজনীতি চলে আসছে, কেউ জানে না এ চলার শেষ কোথায় । প্রকৃত ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের কৃতিত্ব দাবি করা হয়ে থাকে। বাস্তবতা হলো এমনটায় যে, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ছাড়া বাকি সবাই মনে-প্রাণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছেন এবং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কোনো না কোনোভাবে লড়াই ও সংগ্রাম করেছেন।
এত কিছুর পরও কারো অস্বীকার করার কোন ধরনের সুযোগ নেই যে, আমরা একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছি। বিশ্ব দরবারে পৃথক একটা জাতিস্বত্বা হিসেবে মাথা উঁচু করে জানান দেই আমরা বাঙালি। যাদের লড়াই,সংগ্রাম আর জীবণ উৎসর্গের চুড়ান্ত উৎকর্ষের বিনিময়ে অর্জীত আমাদের কাঙ্ক্ষিত মহান বিজয়,নির্দৃষ্ট ভূখণ্ড,ফিরে পেলাম লাল-সবুজের একটি পতাকা,তাদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। আমি আশা বাদি জাতির শ্রেষ্ঠ সূর্য সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মদানের প্রতি এ বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন বর্তমান প্রজন্মতো বটেই আগামী প্রজন্মও এধারা অব্যাহত রাখবে। পবিত্র মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগিয়ে তুলবে পরবর্তী উত্তরোত্তর প্রজন্মকে।আসুন প্রতি হিংসার রাজনীতি বর্জন করি,দেশের প্রকৃত ইতিহাস বুকে ধারণ করি,আর আদর্শিক দেশ প্রেমিক হিসেবে জীবণ গড়ি।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা