
আব্দুর রহমান, সাতক্ষীরা: জলাবদ্ধতা হ্রাসসহ বৃষ্টিপাতের ভারসাম্য বজায় থাকায় চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরাসহ খুলনা অঞ্চলে আমন ধানের বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষক। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শুধুই সবুজের সমারোহ। যতদূর চোখ যায়, দেখা মেলে সোনালি আভার সবুজ ধানখেত। মৃদু বাতাসে দুলছে আমন ধানের শীষ। দূরে সারি সারি গাছপালা আর মাঝখানে গ্রামীণ জনপদ মিলে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে সেজে উঠেছে সাতক্ষীরার গ্রামবাংলা।
অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষি বিভাগের সঠিক পরামর্শে এবার আমন ধানের বাম্পার ফলনের আশা করছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। মাঠজুড়ে এমন চিত্র দেখে কৃষকের মুখে চওড়া হাসি ফুটেছে। ফলন ভালো হওয়ার পাশাপাশি চলতি মৌসুমে খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তারা। কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই সবুজের সমারোহ একদিকে যেমন প্রকৃতিপ্রেমীদের চোখ জুড়াচ্ছে, অন্যদিকে তাদের মনে জাগাচ্ছে সোনালি আশার সঞ্চার। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দিগন্তজোড়া মাঠে বাতাসে দুলছে সবুজ ধানের পাতা।
কৃষকরা বলছেন, রোপণ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত আবহাওয়া বেশ অনুকূলে ছিল। ধানের বয়স বাড়ার এই সময়েও যদি আবহাওয়া অনুকূল থাকে, সময়মতো বৃষ্টি হয়, রোগবালাই কম থাকে এবং সার-কীটনাশক সহজে পাওয়া যায়, তবে গতবারের চেয়ে ফলন অনেক ভালো হবে।
তালা উপজেলার কৃষক শামীম সরদার বলেন, আমি ১ একর জমিতে আমন ধান লাগিয়েছি। আল্লাহর রহমতে এবার ফলন খুব ভালো দেখা যাচ্ছে। গতবারের চেয়ে বিঘাপ্রতি ৩ থেকে ৪ মণ ধান বেশি পাওয়ার আশা করছি। বাজারে যদি ভালো দাম পাই, তবে এই ধান বিক্রি করে সংসারের সমস্ত ঋণ শোধ করতে পারব। তবে বাম্পার ফলনের আশা থাকলেও কৃষকদের একটি অংশ বাজারদর নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় আছেন। উৎপাদিত ফসল সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে তারা সরকারের কাছে সরাসরি ধান ক্রয় এবং উপজেলা পর্যায়ে একটি হিমাগার (কোমোল স্টোরেজ) স্থাপনের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। সূত্রমতে সাতক্ষীরাসহ খুলনা কৃষি অঞ্চলে চলতি মৌসুমে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রার ১০০ দশমিক ১ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ (৪০ কেজি) মোটা আমন ধান ১ হাজার ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
খুলনা কৃষি অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও নড়াইল জেলায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ অঞ্চলে ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭৪ টন পরিষ্কার চাল, অর্থাৎ ১২ লাখ ৮৫ হাজার ৪৬১ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তিনি বলেন, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে কৃষকেরা ২ লাখ ৯০ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫১ হেক্টর বেশি হয়েছে। আমন ধানের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যে ৭৫ হাজার ৪০০ কৃষককে প্রণোদনা হিসেবে ৬ কোটির বেশি টাকা দিয়েছে।
জেলাভিত্তিক তথ্য মোতাবেক সাতক্ষীরায় ৮৯ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ৯০ হাজার ১৬০ হেক্টরে। এ জেলায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮০ টন ধান এবং ২ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫৩ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। খুলনায় ৮৮ হাজার ৩৫১ হেক্টর জমির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৮৭ হাজার ৪৬৯ হেক্টরে আমন আবাদ হয়েছে। এ জেলায় ৪ লাখ ৮ হাজার ৩০৮ টন ধান এবং ২ লাখ ৭২ হাজার ২০৫ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। বাগেরহাটে ৬৮ হাজার ৮৯৩ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬৮ হাজার ৭০৬ হেক্টরে আবাদ হয়েছে। জেলায় ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৭১ হাজার ৬৮৮ টন এবং চালের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৮১ হাজার ১২৫ টন। অন্যদিকে, নড়াইলে ৪৩ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টরে আমন আবাদ হয়েছে। জেলায় ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৬ হাজার ৬৮৬ টন এবং চালের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৯১ টন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা তামান্না তাছনীম বলেন, ‘চলতি মৌসুমে আমন ধানের গাছের বৃদ্ধি ও সামগ্রিক অবস্থা আশাব্যঞ্জক। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম থাকলে ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য কৃষকদের জমিতে নিয়মিত পরিচর্যা, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই দমনে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিতে হবে। আমন ধানের উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।’
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, ‘এ বছর আমনের বাম্পার ফলন আমাদের জেলার কৃষিতে নতুন গতি আনবে। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য ও স্বার্থ রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। মাঠজুড়ে বেড়ে ওঠা প্রতিটি সবুজ ধানের শীষ যেন কৃষকের ঘরে সমৃদ্ধি এবং দেশের খাদ্যভাণ্ডারে নতুন আশার বার্তা বয়ে আনছে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা