
যায়যায়কাল প্রতিবেদক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোতে সভাপতির পদে বিরোধী দলের সদস্যদের না রাখার প্রতিবাদে সংসদ অধিবেশন থেকে বেরিয়ে গেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা।
বুধবার রাত ৯টা ১০ মিনিটের দিকে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নেতৃত্বে জামায়াত এমপিরা সংসদ কক্ষ ছাড়েন।
এর কয়েক মিনিট আগে ১০টি নতুন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। নতুন গঠিত সব কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া হয়েছে বিএনপির সংসদ সদস্যদের।
সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, একটি সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যে সব স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হয়। সংসদে মোট ৫০টি স্থায়ী কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত।
বুধবার নতুন ১০টিসহ ত্রয়োদশ সংসদে মোট ২৫টি স্থায়ী কমিটি গঠিত হলো। এর মধ্যে ১৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি।
এখন পর্যন্ত বিরোধী দলের একমাত্র সদস্য হিসেবে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সভাপতি হয়েছেন সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কোনো স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের কাউকে দেওয়া হয়নি।
‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার বেপরোয়া হচ্ছে’
নতুন কমিটিগুলো গঠনের পর পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন তাহের। তিনি বলেন, সরকারি দলের আচরণের কারণে সংসদে থাকতে বিরোধী দলের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
তাহের বলেন, স্থায়ী কমিটি গঠন নিয়ে এর আগে তারা কথা বলেছেন। কিন্তু চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বিষয়টি আর সংসদে তোলেননি।
তিনি বলেন, ‘কমিটি গঠন নিয়ে সরকারপক্ষের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছিল। সেখানে সংসদে বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যার অনুপাতে ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। কমিটির সদস্যপদের ক্ষেত্রে সরকার তা বজায় রেখেছে। একই অনুপাতে সভাপতির পদেও ২৬ শতাংশ পাওয়াকে আমরা নিজেদের অধিকার মনে করি।’
সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি বা সংসদীয় রীতি-পদ্ধতির কোথাও এ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা নেই। তাহের বলেন, ‘বিষয়টি পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করে।’
বিরোধীদলীয় উপনেতা দাবি করেন, ‘একপর্যায়ে সরকারপক্ষ বিরোধী দলকে ১০টি কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার কথা বলে আমাদের কাছে তালিকাও চেয়েছিল। সে অনুযায়ী আমরা তালিকা জমা দিয়েছিলাম।’
‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সরকার কিছুটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে আমার মনে হয়,’ বলেন তাহের।
তিনি বলেন, ‘কোনো কমিটিতে যোগ দিলে সভাপতির পদ দেওয়া হবে—এভাবে শর্ত দেওয়া অত্যন্ত অশোভন। আমরা বাচ্চা নই যে এভাবে ললিপপ দেখিয়ে প্রলুব্ধ করা যাবে।’
তার ভাষায়, ‘আমরা সভাপতির পদ চাইছি। এটা আমাদের অধিকার। সরকার এই অধিকারকে উপেক্ষা করছে।’
সরকারি দল একতরফাভাবে সব সভাপতির পদ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারে না উল্লেখ করে তাহের বলেন, ‘এই বিধান কোথায় আছে—সংবিধানে, নাকি অন্য কোথাও?’
‘সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছাই যদি আইন ও সংসদের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, তাহলে সেটি স্বৈরতন্ত্রের দিকে যায়,’ বলেন বিরোধীদলীয় উপনেতা।
দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকারকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনাকে সম্মান করার আহ্বান জানান তাহের। সংসদের ভেতরে বা বাইরে নতুন করে কোনো বৈষম্য তৈরি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আরেকটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চাই না।’
পরবর্তী স্থায়ী কমিটিগুলোও একইভাবে গঠন করা হলে বিরোধী দল সংসদ কক্ষে থাকবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তাহের।
‘আনুপাতিক হারে সভাপতির পদ দেওয়ার বিধান নেই’
তাহেরের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। রাত ৯টা ১০ মিনিটের দিকে তিনি কথা বলার সময় জামায়াতের সংসদ সদস্যরা সংসদ কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান।
তবে বিরোধী দলের অন্তত দুই সদস্য—এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সৈয়দ উদ্দিন আহমদ হানজালা—তখনো সংসদে ছিলেন। কয়েক মিনিট পর হানজালাও সংসদ কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান।
জামায়াতের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেননি, বরং সংসদ কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন।
জামায়াতের সদস্যরা বেরিয়ে যাওয়ার সময় সালাহউদ্দিন বলেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা তার বক্তব্য দিয়েছেন। তবে তিনি তখন এর কোনো জবাব শুনতে চাননি।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটি হয়তো ওয়াকআউট নয়, তবে কার্যত এটি ওয়াকআউট।’
স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ আসনসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলকে দেওয়া যায় না উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো বিধান বা বাধ্যবাধকতা নেই। ইতিহাসেও এমন কোনো নজির নেই।’
সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে বিরোধী দলকে ১০টি স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার আলোচনা হয়েছিল বলে যে দাবি বিরোধীদলীয় উপনেতা করেছেন, সেটিও নাকচ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলকে ১০টি সভাপতির পদ দেওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।’
বিরোধী দল সরকারকে ‘স্বৈরাচারী’ বলছে—এমন অভিযোগের জবাবে সালাহউদ্দিন ২০০১ সালের সংসদের উদাহরণ টানেন। তিনি বলেন, ওই সংসদে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন। তারপরও বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেনি। বিএনপি যখনই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে, তখন গণতান্ত্রিক চর্চা আরও শক্তিশালী করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
জুলাই জাতীয় সনদে সংসদে বিরোধী দলের আসনসংখ্যার অনুপাতে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার বিধান রয়েছে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন জানান, সরকার সেই অঙ্গীকারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধনের পর স্থায়ী কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে। তখন বিরোধী দল আসনসংখ্যার অনুপাতে কমিটির সভাপতির পদ পাবে।
এসময় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিরোধী দল সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিরোধী দলের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘সংসদের ভেতরে রাজনীতি করুন, বাইরে নয়। এখানে বসে কথা বলুন।’
সংবিধান সংশোধনকে ‘সংস্কার’ বলতে চাইলে তা বলা যেতে পারে, তবে সংসদীয় ভাষায় এটিকে সংবিধান সংশোধন হিসেবেই গ্রহণ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আগের দিনও মুখোমুখি দুই পক্ষ
স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে রোববারও সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।
সরকারপক্ষের অবস্থান ছিল, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে অংশ নিলে তাদের স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
অন্যদিকে বিরোধী দলের দাবি ছিল, সংসদে তাদের আসনসংখ্যার অনুপাতে স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দিতে হবে। এই দাবির সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটিতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি যুক্ত করতে তারা রাজি নয়। বিশেষ কমিটিতে যোগ না দেওয়ার কথাও জানায় তারা।
নতুন ১০ স্থায়ী কমিটির সভাপতি
বুধবার গঠিত নতুন ১০টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে—
• কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
• শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া।
• মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি সেলিমা রহমান।
• সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হয়েছেন হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল।
• বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী।
• ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি কলিম উদ্দিন আহমেদ।
• তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি আমান উল্লাহ আমান।
• পরিবেশ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি হুইপ জি কে গউছ।
• ভূমি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি নাসের রহমান।
• ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম জামাল।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা