

এরশাদ আলী, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম): হ্যালো আমি উপজেলা সমাজসেবা সেবা অফিস থেকে বলছি। রুবেল, আপনি কি জহির আহমেদ, না আমি ওনার ছেলে, উনার বয়সকে ভাতার বইটি নতুন করে দেওয়া হবে, সেই জন্য মোবাইলে একটা ওটিপি দেওয়া হবে সেটা পুনরায় দিয়ে সহযোগিতা করবেন, হ্যালো রোকেয়া বেগম (ছদ্ম নাম) বলছিলেন আপনি বয়স্ক, বিধবা কিংবা প্রতিবন্ধী ভাতা নিয়মিত পান। আপনার পুরাতন বই কি অফিসে জমা দিয়েছেন। না দিলে অফিসে এসে জমা দিয়ে নতুন বই নিয়ে যাবেন। আপনার ভাতার তথ্য নতুন করে আপডেট করছি। আপনার মোবাইলে একটা ম্যাসেজ গেছে ওটিপিটা কস্ট করে বলেন। এভাবেই হাটহাজারীতে প্রতিনিয়ত বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, অনগ্রসর ভাতা, হিজরা ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন ভাতাভোগীদের কাছ থেকে ভাতার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র।
প্রতারণার শিকার ভাতাভোগী, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কেউ ভাতার জন্য যাবতীয় তথ্যাদি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন (চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট, জাতীয় সনদ, প্রত্যয়নপত্র, ছবি) আবেদন করলে তা যাছাই-বাছাইয়ের পর যদি সিলেক্টেড হয় তাহলে তার ব্যবহৃত একটি মোবাইল নাম্বার (নগদ একাউন্ট করা) জমা দিতে হয়। প্রসেসিং এর পর তার দেয়া মোবাইল নাম্বারে ( নগদ একাউন্ট) ভাতার টাকা আসে। তার পরেই শুরু হয় প্রতারকদের বিভিন্নভাবে প্রতারণা।
প্রতারক চক্র বিশেষ করে গ্রামের সহজ সরল ভাতাভোগীদের বিশেষ করে বয়স্ক নারী পুরুষ, বিধবা নারী, প্রতিবন্ধী নারী পুরুষ, গর্ভবতী নারী ভাতাভোগীদের টার্গেট করে। তারা তাদের তথ্য হ্যাক করে আবেদনে দেয়া মোবাইল নাম্বারে ফোন করে উপরে উল্লেখিত কথা বলে কৌশলে ভাতার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
তবে সম্প্রতি উপজেলায় নতুন করে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন ১৭৫ জন, বিধবা ভাতা পাচ্ছেন ১৭৫ ও প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন ৬০৪ জন নারী পুরুষ। আবেদনের পর প্রায় এক বছর প্রসেসিং এর পর চলতি মাসের শেষের দিক থেকে তারা ভাতা পাচ্ছেন। বছরখানিক প্রসেসিং এ থাকলেও পুরো এক বছরের ভাতাই পাচ্ছেন তারা। পুরাতন ভাতাভোগীদের পাশাপাশি নতুনরাও পড়ছেন প্রতারক চক্রের খপ্পরে। অনেকের মোবাইলে ভাতার টাকা আসার কয়েকদিন আগে থেকেই প্রতারক চক্র ফোন করে কৌশলে কারো ওটিপি, কারো নগদের পিন কারোবা ছয় নাম্বারের ডিজিট নিয়ে নিচ্ছে। পরবর্তীতে ভাতার টাকা প্রথমে নগদ একাউন্টে দেখা গেলেও মুহুর্তে অদৃশ্য।
প্রতারকের খপ্পরে পড়া উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের কুলছুমা খাতুন (৬৫)'র ছেলে খোকন বলেন, আমার মা এবার নতুন বয়স্ক ভাতা পেয়েছেন। রোববার (২৬ মে) নগদ একাউন্টে (মোবাইলে) এক মাসে ৬০০ টাকা করে বারো মাসের ৭ হাজার ২০০ টা আসে। পরদিন টাকা তুলতে গিয়ে দেখি টাকা নাই। যেদিন টাকা আসে সেদিন এবং তার দুতিনদিন আগে তিনটা নাম্বার থেকে ( 01304644981, 0319638798273, 0319638596532) ফোন করে কখনো সমাজসেবা অধিদপ্তর কখনোবা উপজেলা সমাজসেবা অফিসের নাম দিয়ে একটি ম্যাসেজ দিয়ে ওটিপি দিতে বলে। আমরা বিশ্বাস করে ওটিপি নাম্বার দিয়েছিলাম। প্রতারক চক্রদের অভিনব কৌশল আমরা বুঝতে পারিনি।
একই কথা বলেন, হাটহাজারী পৌরসভা ৭ নং ওয়ার্ডের প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী সুজন কুমার নাথ ও তার বোন প্রতিবন্ধী সুপ্রীতি রানি নাথ। একইভাবে হাতিয়ে নেন একই ওয়ার্ডের বয়স্কভাতা ভোগী তরলা বালা নাথ।
পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের বিধবা ভাতাভোগী পারভিন আক্তার বলেন, তার নাম্বারে ফোন করে উপজেলা সমাজসেবা অফিস থেকে বলছেন আপনার নতুন বই নিয়ে যাবেন। আপনার ভাতার আপডেট চলছে। এক্ষুনি একটা ম্যাসেজ যাবে। ছয় নাম্বারের সংখ্যাটা বলেন। ম্যাসেজ আসলেই ছয় নাম্বারের ডিজিট টা বলে দেন। ব্যাস দোকানে টাকা তুলতে গিয়ে দেখেন ব্যালেন্স জিরো।
এদিকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের (মা'য়ের) নাম্বারে ফোন করে শিক্ষা উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফতেপুর মেহেরনেগা উচ্চ বিদ্যালয় ও ফতেপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, মেখল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নেয়ার কথা বলেছেন সময়ের কাগজকে। একইসাথে উপজেলা ও পৌরসভার গর্ভবতী ভাতাভোগীরাও পড়ছেন প্রতারক চক্রের কবলে। কেবল পৌরসভায় গত তিন মাসে ৫০ জনের অধিক ভাতাভোগী তাদের টাকা খুঁইয়েছেন বলে জানান মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা। ইতিমধ্যে সাড়ে তিনশ ভাতাভোগীকে এ বিষয় ফোন করে সতর্ক ও সচেতন করা হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
এবিষয়টি নজরে আসায় বিভিন্ন ইউনিয়নের পেইজে সতর্কতা ও সচেতনতামূলক পোষ্ট দিতে দেখা গেছে। প্রতিনিয়ত ভাতাভোগীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছে স্বীকার করে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, বেশ কয়েকমাস ধরে একটি চক্র এ কাজটি করে যাচ্ছে। কখনো সমাজসেবা অধিদপ্তর কখনো বা উপজেলা সমাজসেবার নাম দিয়ে প্রতারণা করে যাচ্ছে। আমাদের কাছে ভুক্তভোগীরা যোগাযোগ করলেই তাদের একাউন্ট, পিন পরিবর্তন করে দেয়া হচ্ছে। এ প্রতারণা থেকে বাঁচতে হলে সচেতনতার বিকল্প নাই। ভাতাভোগীদের বার বার বলা হচ্ছে এ ধরনের কোন কথা সমাজসেবা অফিস বলবেনা। কেউ ফোন করলে স্ব স্ব ইউনিয়নের অফিসারের সাথে যোগাযোগ করবেন। কিন্ত গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো প্রতারক চক্রের অভিনব ফাঁদে পড়ে যান।
জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ফরিদুল আলম বলেন, এটা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। আগে বেশি ছিল এখন অনেকটা কমে গেছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত আছেন। ভাতাভোগীদের সচেতনতার বিকল্প নাই। সমাজে যারা সচেতন তারা যদি বিষয়টি ভাতাভোগীদের বুঝিয়ে দেন তাহলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভবনা থাকবেনা। ইতিমধ্যে সকল ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য এবং উপজেলা পর্যায়ে এ বিষয়ে সচেতন করতে তাগাদা দেয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ.বি.এম মশিউজ্জামান বলেন, বিষয়টি শুনেছি। তিনি তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের এ বিষয়ে ভাতাভোগীদের সচেতন করতে অনুরোধ জানান।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা