

হৃদয় দেবনাথ, স্টাফ রিপোর্টার : দেশের চা-বাগানে কর্মরত শ্রমিকরা তাদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে ২০২২ সালের ৯ আগস্ট থেকে আন্দোলনে নামেন। চলে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট, সড়ক-মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ। দফায় দফায় শ্রমিকদের সঙ্গে বাগান মালিকপক্ষ ও সরকারের প্রতিনিধিরা বৈঠক করলেও তা সফল হয়নি।
পরে ওই বছরের ২৭ আগস্ট গণভবনে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে আড়াই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চা-শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ১৭০ টাকা ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে প্লাকিং বোনাস (বাড়তি পাতা তোলার জন্য অর্থ), ভর্তুতি মূল্যে রেশন বৃদ্ধি, চিকিৎসাসুবিধা, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের পেনশন, চা-শ্রমিকদের পোষ্যদের শিক্ষা বাবদ ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, গোচারণভূমি বাবদ ব্যয়, বিনামূল্যে বসতবাড়ি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ শ্রমিককল্যাণ কর্মসূচি, উৎসব ভাতা, ভবিষ্যৎ-তহবিল, বার্ষিক ছুটি, অসুস্থতা ছুটি বৃদ্ধি, বেতনসহ উৎসব ছুটি আনুপাতিক হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের অনেকগুলো আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এ নিয়ে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ।তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত তারা বিনাবাক্যে মেনে নিয়েছেন। তবে এখনও মালিকপক্ষ অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রেখেছে তাদের।
দেশের চা-শিল্পের ইতিহাস ১৬৯ বছরের হলেও আজও তাদের ভূমির অধিকার দেওয়া হয়নি। বাগানের জমিতে মালিকপক্ষের নির্মিত ঘরের অধিকাংশই জরাজীর্ণ। ৮ হাত বাই ১২ হাতের ঘরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন তারা। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ঘরগুলো মেরামতের বিধান থাকলেও তা করা হচ্ছে না। এমনকি নিজেরা ঘরের মেরামত করতে চাইলেও কোম্পানি (বাগান কর্তৃপক্ষ) বাধা দেয়। এ ছাড়া চা-শ্রমিকদের বকেয়া মজুরির ৪ হাজার টাকা করে প্রথম কিস্তি মালিকপক্ষ পরিশোধ করলেও বাকি টাকা দেওয়া হচ্ছে না। কবে দেওয়া হবে তা-ও তাদের জানানো হচ্ছে না।
পরে ওই বছরের ২৭ আগস্ট গণভবনে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে আড়াই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চা-শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ১৭০ টাকা ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে প্লাকিং বোনাস (বাড়তি পাতা তোলার জন্য অর্থ), ভর্তুতি মূল্যে রেশন বৃদ্ধি, চিকিৎসাসুবিধা, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের পেনশন, চা-শ্রমিকদের পোষ্যদের শিক্ষা বাবদ ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, গোচারণভূমি বাবদ ব্যয়, বিনামূল্যে বসতবাড়ি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ শ্রমিককল্যাণ কর্মসূচি, উৎসব ভাতা, ভবিষ্যৎ-তহবিল, বার্ষিক ছুটি, অসুস্থতা ছুটি বৃদ্ধি, বেতনসহ উৎসব ছুটি আনুপাতিক হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের অনেকগুলো আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এ নিয়ে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ।
তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত তারা বিনাবাক্যে মেনে নিয়েছেন। তবে এখনও মালিকপক্ষ অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রেখেছে তাদের। দেশের চা-শিল্পের ইতিহাস ১৬৯ বছরের হলেও আজও তাদের ভূমির অধিকার দেওয়া হয়নি। বাগানের জমিতে মালিকপক্ষের নির্মিত ঘরের অধিকাংশই জরাজীর্ণ। ৮ হাত বাই ১২ হাতের ঘরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন তারা। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ঘরগুলো মেরামতের বিধান থাকলেও তা করা হচ্ছে না। এমনকি নিজেরা ঘরের মেরামত করতে চাইলেও কোম্পানি (বাগান কর্তৃপক্ষ) বাধা দেয়। এ ছাড়া চা-শ্রমিকদের বকেয়া মজুরির ৪ হাজার টাকা করে প্রথম কিস্তি মালিকপক্ষ পরিশোধ করলেও বাকি টাকা দেওয়া হচ্ছে না। কবে দেওয়া হবে তা-ও তাদের জানানো হচ্ছে না।
মৌলভীবাজারের প্রেমনগর চা-বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সুভাষ ভৌমিক বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের শুরুতে চা-শ্রমিকদের কাঁচা ঘরবাড়ি কোম্পানি মেরামত করে দেওয়ার কথা। এখন বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ঘর মেরামত করে না দেওয়ায় অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে আমরা বসবাস করছি। এ ছাড়া আরও সমস্যায় রয়েছেন প্রেমনগর চা-বাগানসহ দেশের অন্যান্য চা-বাগানের শ্রমিকরা। এ নিয়ে গত ২৫ এপ্রিল আমরা বাগানে তিন ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করেছি। আমাদের দাবিগুলো দ্রুত সমাধান করা না হলে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি দেব।’
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চান্দপুর চা-বাগানের এক শ্রমিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এখনও দেশে চা-বাগানগুলোর শ্রমিকরা নিগৃহীত ও অবহেলিত। শত শত বছর ধরে আমরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সংসার চালালেও মালিকপক্ষ আমাদের ব্যাপারে উদাসীন। অমানুষিক পরিশ্রমের পরও আমরা শ্রমবৈষম্যের শিকার। প্রতিবছর শ্রমিক দিবসে সভা-সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে আমাদের কথা বলা হলেও পরে তা আড়ালেই থেকে যায়।’ শ্রীমঙ্গলের ভুরভুরিয়া চা-বাগানের নিবন্ধিত নারী শ্রমিক সাবিত্রী মৃধা বলেন, ‘চা-বাগানে আমাদের মজুরি হলো ১৭০ টাকা। কিন্তু বাজারে তো জিনিসের অনেক দাম। বর্তমানে এ টাকা দিয়ে চলা দায়। প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের প্রতি আরেকটু সহায় হতেন, তবে আমরা পরিবার নিয়ে একটু শান্তিতে বাঁচতে পারতাম। আমাদের ঘরগুলোও বসবাসের অনুপযোগী। এগুলো মেরামত ও আমাদের ভূমির অধিকার দেবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাচ্ছি।’
মৌলভীবাজারের দেওরাছড়া চা-বাগানের শ্রমিক ব্রিটিশ ঘাটুয়াল বলেন, ‘চা-বাগানের অনেক শ্রমিক পরিবারে সদস্যসংখ্যা ৭ থেকে ১০ জন। তবে বাগানের কাজ পায় পরিবারের ১ জন সদস্য। অধিকাংশ শ্রমিক পরিবারই ওই ১৭০ টাকা মজুরির ওপর নির্ভরশীল। এবারের মে দিবসে আমাদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও মালিকপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
ভুরভুরিয়া চা-বাগানের নারী শ্রমিক মনি মৃধা বলেন, ‘হামনে ১৭০ টাকা দিয়ে চলে না। হামনেকে জিনিসপাতিকে বহুত দাম। হামনে এক বেলা খানিকে দুবেলা উপাস, পানি খায়ে চলে। এভাবে হামকে চলে না।’ভাড়াউড়া চা-বাগানের শ্রমিক সর্দার মানিক গোয়ালা বলেন, ‘বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টি বিবেচনা করে আমাদের মজুরির বিষয়টি যদি পুনর্বিবেচনা করা হতো, তাহলে আমরা দুবেলা দুমুঠো খেয়ে বাঁচতে পারব।’
ভুরভুরিয়া চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সুধীর রিকিয়াশন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ সত্ত্বেও আমাদের বাড়তি হাজিরা যেটা দেওয়ার কথা, তা দেওয়া হচ্ছে না। এ পর্যন্ত মাত্র ৪ হাজার টাকা পেয়েছি। বাকি টাকা দ্রুত দেওবার দাবি জানাচ্ছি।’
সিলেট চা জনগোষ্ঠী ছাত্র যুব কল্যাণ পরিষদের নেতা সুজিত বাড়াইক বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর শ্রমিক দিবসে শ্রমিকদের অধিকারের কথা বলি। কিন্তু পরিস্থিতি যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে গেছে। ২০২২ সালে আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। যখন মজুরি বেড়েছে তখন বাজারে দ্রব্যমূল্য যা ছিল তা থেকে এখন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা ছিল তা হয়নি। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী মমতাময়ী মা হিসেবে চা-শ্রমিকদের বিষয়টি বিবেচনা করে আরও কিছুটা মজুরি বৃদ্ধি করে দেবেন।’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের মনু-ধলাই ভ্যালি কমিটির সভাপতি ধনা বাউরি বলেন, ‘১৭০ টাকায় একটি শ্রমিক পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্যের সংস্থান করা কঠিন। এটি বিবেচনা করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর অনুরোধ জানাচ্ছি। এ ছাড়া আমাদের ভূমির অধিকার নেই। এ দেশের নাগরিক হলেও আমাদের কোনো ভূমি নেই। বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাচ্ছি।’
বাংলাদেশ চা জনগোষ্ঠী আদিবাসী ফ্রন্টের সভাপতি পরিমল সিং বাড়াইক বলেন , ‘বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন যারা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলে, সে ট্রেড ইউনিয়নের বর্তমান নেতৃত্ব অনেকটা দুর্বল। তারা সরকারের সঙ্গে লিয়াজোঁ মেইনটেন করতে পারছে না; মালিকপক্ষের সঙ্গে তারা কথা বলতে পারছে না; মালিকপক্ষ তাদের কথা শুনছে না। অনেকবার বৈঠক হয়েছে চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট) করার জন্য কিন্তু তারা অ্যাগ্রিমেন্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে।’ বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হাজরা বলেন , ‘শতভাগ ভূমিহীন আমরা। প্রধানমন্ত্রী ভূমিহীনদের ভূমি দিচ্ছেন। আমরা যে ভূমিতে বসবাস করছি, সেসব জমি নিজ নিজ নামে করে দেবার অনুরোধ জানাচ্ছি প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আমরা এ দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। আমাদের আরও কিছু দাবির মধ্যে বাসস্থান, মজুরি বৃদ্ধিসহ চাকরিক্ষেত্রে কোটা চালু করার। আমাদের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করছে, শিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মেধাবীদের তুলনায় আমাদের সন্তানরা কিছুটা পিছিয়ে আছে। চাকরিক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করে আমরা পারব না। তাই আমাদের কোটায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাচ্ছি।’
দেশে বর্তমানে চা-জনগোষ্ঠী ৭ লক্ষাধিক। তার মধ্যে দেশের নিবন্ধিত ১৬৭টি চা-বাগানে নিবন্ধিত শ্রমিক রয়েছেন প্রায় ৯৪ হাজার। আর অনিয়মিত শ্রমিক রয়েছেন ৪০ হাজার। ২০০৭ সালে প্রথম শ্রেণির বাগানগুলোতে নিবন্ধিত শ্রমিকের মজুরি ছিল দৈনিক ৩২ টাকা ৫০ পয়সা; ২০০৯ সালে ৪৮ টাকা; ২০১৩ সালে হয় ৬৯ টাকা; ২০১৫ সালে ৮৫ টাকা; ২০১৬ সালে ১০২ টাকা; ২০১৮ সালে ১২০ টাকা এবং বর্তমানে ১৭০ টাকা।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা