
সাইদুল ইসলাম আবির, সিরাজগঞ্জ: ফুলজোড় নদীর তীরে একটি গাছের ছায়ায় বসে বাঁশের সরু ফালি হাতে কুলা বুনছিলেন সুশান্ত চন্দ্র তরুণী দাস। পাশে রাখা কয়েকটি তৈরি কুলা। একটু দূরেই স্তূপ করে রাখা বাঁশ। নদীর পাড়ের বাতাসে গাছের পাতা নড়ছে, আর সেই ছায়ায় বসে আপন মনে বাঁশের বেঁতি একটার পর একটা গেঁথে চলেছেন ৬৫ বছর বয়সী এই কারিগর।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের শিমলা খেয়াঘাট এলাকার বাসিন্দা সুশান্ত। বাপ-দাদার পেশা ছিল এই কুটিরশিল্প। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনিও এ কাজে যোগ দেন। এরপর কেটে গেছে প্রায় ৫০ বছর। জীবনের অর্ধশতক পার করে এখনো ফুলজোড় নদীর পাড়ে বসেই বাঁশ ও বেতের কুলা তৈরি করে চলেছেন তিনি।
সপ্তাহে ২০ থেকে ৩০টি কুলা তৈরি করেন সুশান্ত। কুলা বিক্রি করে যে টাকা পান, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলে। সংসারের খরচ মেটানোর পর মাসে তাঁর হাতে থাকে মাত্র হাজার খানেক টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই এক ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। আরেক মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন।
কথা বলতে বলতে হাত থামান না সুশান্ত। বাঁশের ফালি বুনতে বুনতে বলেন, “ছোটবেলা থেইকাই এই কাম করি। আমার বাপ-দাদার কাম আছিল। ১৫ বছর বয়সে আমিও ধরছি। এই কাম কইরাই সংসার চালাইছি। ছেলেমেয়েরে মানুষ করছি।”
সুশান্তের কাছে কুলা শুধু জীবিকার উপায় নয়, পরিবেশের জন্যও একটি ভালো জিনিস। প্লাস্টিকের তৈরি নানা সামগ্রীর বদলে বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিস ব্যবহারের কথা বলেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, “বাঁশের কুলা মাটিতে পইড়া থাকলেও মিশ্যা যায়। প্লাস্টিকের মতো জায়গা নষ্ট করে না। মানুষ যদি বাঁশের কুলা বেশি ব্যবহার করে, আমাগোও কাম থাকে, পরিবেশও ভালো থাকে।” তবে কুলা বানিয়ে পরিবেশ রক্ষার চেষ্টা করলেও নদীর বর্তমান অবস্থা তাঁকে কষ্ট দেয়।
প্রায় ৫০ বছর ধরে ফুলজোড় নদীর পাড়ে বসে কাজ করছেন সুশান্ত। তাঁর চোখের সামনে বদলেছে নদী, বদলেছে আশপাশের পরিবেশও। নদীতে বিভিন্ন ধরনের ময়লা ও রাসায়নিক পদার্থ পড়তে দেখেছেন তিনি। এতে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর ক্ষতি হচ্ছে বলে তাঁর ধারণা।
নদীর দিকে তাকিয়ে সুশান্ত বলেন, “এই নদীর পাড়েই তো আমার জীবন গ্যাছে। আগে নদীটা অনেক ভালো আছিল। মাছ আছিল, পানিও ভালো আছিল। এ্যাহন নানা ময়লা-আবর্জনা পড়ে, কেমিকেলও পানিতে যায়। পানির অবস্থা দেইখা মনডা খারাপোই লাগে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলেন, “আমি তো বাঁশের কুলা বানাই, মানুষরে কই প্লাস্টিক কম ব্যবহার করতে। পরিবেশ ভালো রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু চোখের সামনে নদীডা নষ্ট হইতে দেখলে কষ্ট লাগে।”
সুশান্তের তৈরি কুলা স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। সপ্তাহে ২০ থেকে ৩০টি কুলা তৈরি করতে পারলেও এ কাজ থেকে আয় খুব বেশি নয়। বাঁশ কেনা, সংসারের খরচসহ নানা ব্যয় মেটানোর পর তাঁর হাতে খুব সামান্য টাকা থাকে।
তিনি বলেন, “এহন আগের মতো কাম নাই। খরচও বাড়ছে। কুলা বানাইয়া যা পাই, তা দিয়া সংসার চলে। সব খরচ বাদ দিয়া মাসে হাজার-দেড় হাজার টাকা থাকে কি না থাকে। তয় এই কাম কইরাই তো পোলারে পড়াইছি, মাইয়ার বিয়া দিছি।”
ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করতে পেরেছেন—এটাই তাঁর কাছে জীবনের বড় পাওয়া। মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী।
সুশান্তের ভাষ্য, আগের তুলনায় বাঁশ-বেতের পণ্যের ব্যবহার কমেছে। বাজারে প্লাস্টিকের নানা পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ সেদিকে বেশি ঝুঁকছে। এতে কুটিরশিল্পের কারিগরদের কাজও কমে গেছে।
তিনি বলেন, “আগে কুলার কদর আছিল। এহন প্লাস্টিকের জিনিস কম দামে পাওয়া যায়। তাই অনেকে বাঁশের জিনিস নিতে চায় না। তয় গেরামের মানুষ এখনো কুলা নেয়। এই কামটা থাকলে আমাগো মতো গরিব মানুষের সংসারও চলে।”
নদীর তীরে বসে কুলা বানানো সুশান্তের জীবনের সঙ্গে ফুলজোড় নদীর সম্পর্ক যেন একসঙ্গে গাঁথা। নদীর পাড়ের গাছের ছায়ায় বসেই পাঁচ দশক ধরে তিনি জীবিকা চালিয়েছেন। এখন বয়সের ভার এসেছে, কিন্তু হাতের কাজ থামেনি।
কথা শেষ করে আবার কুলা তৈরিতে মন দেন তিনি। বাঁশের সরু ফালিগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি জুড়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয় একটি কুলা। গাছের ছায়ায় বসে থাকা এই বৃদ্ধ কারিগরের হাত থামে না।
পাশেই বয়ে চলেছে ফুলজোড় নদী। সেই নদীর পাড়েই তাঁর শৈশব কেটেছে, যৌবন পেরিয়েছে, সন্তানদের বড় করেছেন। এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর হাতে বাঁশের কুলা, আর চোখের সামনে বদলে যাওয়া নদী।
একদিকে টিকে থাকার লড়াই, অন্যদিকে নদী ও পরিবেশ বাঁচানোর আকুতি—ফুলজোড়ের তীরে গাছের ছায়ায় বসে সুশান্তের জীবন যেন সেই দুই গল্পই বলে।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা