
যায়যায়কাল ডেস্ক: ভারতে হিন্দুদের খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরের চেষ্টা করার অভিযোগে গুরুতর ফৌজদারি মামলায় জড়িয়েছেন ব্রিটিশ এক ধর্মীয় নেতা। বিতর্কিত ও এখনো কার্যকর না হওয়া একটি নতুন আইনের আওতায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। খবর দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের।
৫০ বছর বয়সী পঙ্কজ দেবনুর ম্যানচেস্টারে অ্যাংলিকান এপিসকোপাল চার্চ ইন্টারন্যাশনালের অধীনে একটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দেন। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর পুনেতে একটি গির্জার ১৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। ১০ দিনব্যাপী ওই আয়োজনে ধর্মীয় বক্তব্য ও সংগীত পরিবেশনের কথা ছিল।
তবে গত ৭ আগস্ট একদল হিন্দু ব্যক্তি গির্জার প্রাঙ্গণে ঢুকে পঙ্কজ দেবনুরকে ধর্মপ্রচারক হিসেবে অভিযুক্ত করলে অনুষ্ঠানটি বাধাগ্রস্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত করা হয়। তাদের অভিযোগ, তিনি স্থানীয় হিন্দুদের খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হতে উৎসাহিত করছিলেন।
ভারতের গণমাধ্যমে ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। কারণ, মহারাষ্ট্র রাজ্যের নতুন ‘ফ্রিডম অব রিলিজিয়ন অ্যাক্ট ২০২৬’-এর আওতায় এটি প্রথম দিকের নথিভুক্ত মামলাগুলোর একটি হিসেবে সামনে আসে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এ ধরনের ‘ধর্মান্তরবিরোধী’ আইন প্রস্তাব করেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এসব আইন সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করছে—এমন আশঙ্কাকে উসকে দেয়।
তবে পরে মামলায় নাটকীয় মোড় আসে। জানা যায়, পঙ্কজ দেবনুরের নাম পুলিশের প্রাথমিক অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করার সময় মহারাষ্ট্রের নতুন আইনটি কার্যকরই হয়নি। যদিও অভিবাসন আইন লঙ্ঘনসহ অন্য আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পঙ্কজ দেবনুরকে গ্রেপ্তার করা না হলেও ভারতীয় গণমাধ্যমে তার নাম ও ঠিকানা প্রকাশ করা হয়েছে। আদালত তাকে জামিন দিলেও শর্ত হিসেবে দেশের বাইরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে থাকা তার পরিবারের সদস্যরা হিন্দুদের খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছেন। তারা পুলিশের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন। একই সঙ্গে ভারতে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা পঙ্কজের নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা করছেন।
পঙ্কজের মেয়ে মানালি দেবনুর দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, “সবকিছু এত দ্রুত এবং হঠাৎ ঘটেছে যে আমরা কিছু বুঝে ওঠার সুযোগই পাইনি। তার ফোন নিয়ে নেওয়া হয়েছিল, ফলে আমরা তার সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলতে পারিনি।”
মানালি জানান, তার বাবা পুনের পবিত্রনাম দেবালয়া গির্জায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছিলেন। এ সময় একদল ব্যক্তি অনুষ্ঠানে ঢুকে আয়োজকদের ধর্মান্তর কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ করেন।
পঙ্কজের বন্ধু এলভিনা ভিক্টর বলেন, “ঘটনাটি খুবই অপ্রীতিকর ও কষ্টদায়ক ছিল। সেখানে খুব শান্তিপূর্ণ একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলছিল। হঠাৎ সেটিতে বাধা দেওয়া হয়, আপত্তি জানানো হয় এবং পুরো অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।”
রিকশাচালক অমিত রাজু ভোসালে (৩১) নামের এক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে পঙ্কজের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, তিনি হিন্দুধর্ম সম্পর্কে ‘ভুল ধারণা’ ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত লোকজনকে ধর্মান্তরিত করার জন্য ‘প্রলুব্ধ’ করেছেন।
ভারতে ‘ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া’ (ওসিআই) হিসেবে তার অভিবাসন মর্যাদা অনুযায়ী পঙ্কজ প্রার্থনা সভা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারলেও পুলিশের দাবি, অনুমতি ছাড়া তিনি ধর্মীয় বক্তব্য বা প্রচার করতে পারেন না।
পুনের উপপুলিশ কমিশনার প্রশান্ত অমৃতকর দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, পঙ্কজ ‘মিশনারি কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন’। তবে তিনি নিশ্চিত করেন, পঙ্কজকে আটক করা হয়নি। তার গ্রেপ্তার বা বহিষ্কারের সম্ভাবনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।”
তবে পঙ্কজকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়া আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, “কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে ওই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অন্য ধর্মের লোকজনকে ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্য ছিল।”
আদালত আরও জানায়, অভিযোগকারী রিকশাচালকসহ ওই দলটি ‘ভুল ধারণার’ ভিত্তিতে গির্জায় প্রবেশ করেছিল। তারা অনুষ্ঠানটিকে হিন্দুদের জন্য আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলে মনে করেছিল এবং গির্জার প্রচারণামূলক একটি ছবিকে হিন্দু মন্দিরের ছবি হিসেবে ভুল বুঝেছিল।
আদালত বলে, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, এটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একটি অনুষ্ঠান ছিল।” আদালত আরও উল্লেখ করে, সেখানে প্রবেশে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে অন্য ধর্মের মানুষদের ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্যে সেখানে ডাকা হয়েছিল।
তবে এই জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার পর জানা যায়, মহারাষ্ট্রের নতুন ‘ফ্রিডম অব রিলিজিয়ন অ্যাক্ট’ তখনও কার্যকর হয়নি। আগামী ২৮ আগস্ট আইনটি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
পুলিশ অবশ্য তাদের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, ৩১ জুলাই রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ায় তারা আইনটি কার্যকর হয়েছে বলে ধরে নিয়েছিল। তবে আদালতে শুনানির সময় বিষয়টি কীভাবে উঠে আসেনি, তা স্পষ্ট নয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ধর্মান্তরবিরোধী আইনের আওতায় করা অভিযোগ প্রত্যাহার করা হবে। তবে ২০২৫ সালের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্টসহ অন্যান্য আইনে পঙ্কজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
পঙ্কজের আইনজীবী বিজয়সিং থোমবারি দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে জানান, আদালতের দেওয়া জামিনের শর্তগুলো এখনো বহাল রয়েছে। ফলে আদালতের অনুমতি ছাড়া পঙ্কজ ভারত ছাড়তে পারবেন না। পাশাপাশি প্রতি সোমবার, বুধবার ও শুক্রবার তাকে স্থানীয় থানায় হাজিরা দিতে হবে।
পঙ্কজের আইনি লড়াইয়ের খরচ এবং তাকে ম্যানচেস্টারে ফিরিয়ে আনতে তার পরিবার একটি অনলাইন তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। ১০ হাজার পাউন্ড লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ইতোমধ্যে ৬ হাজার ৬০০ পাউন্ডের বেশি সংগ্রহ হয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মামলাটি পঙ্কজকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে ফেলেছে এবং তার চাকরি ও জীবিকায় প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক পোস্ট এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের কারণে তিনি ‘তীব্র মানসিক ও আবেগিক চাপের’ মধ্যে রয়েছেন। এসব প্রতিবেদনে তাকে ‘মানহানিকরভাবে’ উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও পরিবারের অভিযোগ।
পঙ্কজের ছেলে পুনিত, যিনি তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগটি শুরু করেছেন, লিখেছেন, তার বাবা এর আগে চার্চ অব ইংল্যান্ডে ধর্মীয় সেবায় যুক্ত ছিলেন এবং এনএইচএস হাসপাতালগুলোতে অসুস্থ রোগীদের সেবা করতেন।
তিনি লিখেছেন, “আমার বাবা জীবনের বড় একটি অংশ অন্যদের সেবায় ব্যয় করেছেন। তিনি সবসময় আমাদের পরিবার এবং আরও অনেক মানুষের নির্ভরতার জায়গা ছিলেন।”
মানালি দেবনুর জানান, পরিবারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো তার বাবাকে নিরাপদে যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে আনা। গণমাধ্যমে তার বাবার নাম ও অবস্থান প্রকাশিত হওয়ার পর পরিবারের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা যুক্তরাজ্যে থাকি এবং ভারতে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন পড়ি। আমরা যা পড়েছি, তা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।”
তিনি আরও বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো তার নিরাপত্তা। বিশেষ করে তার নাম, সঠিক অবস্থান ও ঠিকানা—এ ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। এটি খুবই ভীতিকর।”
“আমাদের অগ্রাধিকার হলো, তিনি যেন নিরাপদে দেশে ফিরে আসতে পারেন। সেটিই প্রথম বিষয়। এরপর কী করা প্রয়োজন, তা আমরা দেখব।”
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট।
মামলাটির পরবর্তী শুনানি আগামী ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা