

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগে মাত্র এক মাস আগেই ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।
শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকায় ফেরদৌস স্টিলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক অসুস্থ ও গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ডিআইএফইয়ের তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়ার্ডে নোঙর করা এলএনজি পরিবহনকারী একটি পুরোনো জাহাজের ভেতরে স্ক্র্যাপ কাটিংয়ের কাজ করছিলেন শ্রমিকরা।
কাজ চলার সময় হঠাৎ জাহাজের ভেতরে গ্যাস লিকেজ হয়ে অতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়ে শ্রমিকদের তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং অনেকে অচেতন হয়ে পড়েন।
ঘটনাস্থলেই পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন শ্রমিক মারা যান।
ডিআইএফই সূত্রে জানা গেছে, ফেরদৌস স্টিলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডটি এর আগে একাধিকবার পরিদর্শন করা হয়েছিল। পরিদর্শনে পেশাগত ও অগ্নিনিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ত্রুটি শনাক্ত করা হয়।
চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে শিপইয়ার্ডটিতে গিয়ে কর্মকর্তারা কিছু ব্যত্যয় দেখতে পান। এরপর গত ২ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিলকে নোটিশ দেওয়া হয়।
তিনি জানান, কয়েক দফা তাগিদ দেওয়ার পরও কারখানা কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করায় গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
ডিআইএফইয়ের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার কারখানাটি পরিদর্শন করে বেশ কিছু নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়। এসব ত্রুটি সংশোধনের জন্য কারখানা কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়।
পরে ৪ মে আবার পরিদর্শন করে আগের নির্দেশনার অগ্রগতি না পাওয়ায় কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেওয়া হয়।
এরপর ৮ জুন অগ্নিনিরাপত্তা ও পেশাগত নিরাপত্তা জোরদারের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ ও তাগিদপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করার অভিযোগে ১৫ জুলাই শ্রম আদালতে মামলা করা হয়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ডিআইএফইয়ের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যায়। এ সময় স্থানীয় উত্তেজিত জনতার হামলায় অধিদপ্তরের দুই শ্রম পরিদর্শক গুরুতর আহত হন বলে জানা গেছে।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা যৌথভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
স্থানীয় শ্রমিকনেতা ফজলুর কবির মিন্টু বলেন, জাহাজের ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য বা গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের সেখানে প্রবেশ করানো হয়ে থাকতে পারে। তাঁর অভিযোগ, এটি মালিকপক্ষের গাফিলতির প্রমাণ।
তিনি আরও জানান, বন্ধের দিনও শিপইয়ার্ডে কাজ চলছিল। এসব বিষয় তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ফেরদৌস স্টিলের শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি ভাঙার অনুমতি ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, জাহাজ ভাঙার অনুমতি শুধু পরিবেশ অধিদপ্তর দেয় না; বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ আরও কয়েকটি সংস্থার অনুমতি প্রয়োজন হয়।
তিনি বলেন, ওই কোম্পানির কোন জাহাজের অনুমোদন রয়েছে এবং কোনটির নেই, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুরো এলাকা ঘিরে রাখায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকেরা ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি। তদন্তের পর বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
দুর্ঘটনার কারণ, নিরাপত্তা ত্রুটি এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণে তদন্ত চলছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক :মোঃ আলামিনুল হক,নিবার্হী সম্পাদক :আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইসমাইল
যোগাযোগ :ফোনঃ +৮৮০২৫৭১৬০৭০০,মোবাইলঃ ০১৭১২৯৪১১১৬,Emails:jaijaikalcv@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : ১২০/এ, আর. এস. ভবন, ৩য় তলা, মতিঝিল, ঢাকা