শুক্রবার, ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ,১৬ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

ইরানে এই নেতৃত্বহীন বিক্ষোভ টিকবে কি?

যায়যায়কাল ডেস্ক: দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইরানে চলছে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। আর এই বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করছে দেশটির সরকার।

তবে বিক্ষোভকারীরা আর কত দিন রাস্তায় থাকবেন বা থাকতে পারবেন, তা ‘স্পষ্ট নয়’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইতোমধ্যে এই বিক্ষোভে অন্তত দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে এক ইরানি সরকারি কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রয়টার্স।

দেশটিতে বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেটও। এমনকি ইলন মাস্ক তার স্টারলিংক সংযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলেও ইরান তা বন্ধ করে দিতে সমর্থ্য হয়েছে।

ফলে, বিক্ষোভকারীরাও ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারছেন না যে এই মুহুর্তে সারা দেশে আন্দোলন কোন পর্যায়ে রয়েছে বা ঠিক কতটা ছড়িয়ে পড়েছে।

আল জাজিরাকে জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়নের অধ্যাপক ভালি নাসর বলেন, ‘একটি শহরের খবর বা ছবি দেখে অন্য শহরের মানুষ যে উত্তেজিত হবে বা আন্দোলনে নামতে অনুপ্রাণিত হবে, সেটা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই বিক্ষোভে কোনো নেতৃত্ব নেই, কোনো সংগঠনও নেই। এগুলো আসলে জনরোষের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। আর নেতৃত্ব, দিকনির্দেশনা ও সংগঠন ছাড়া এ ধরনের বিক্ষোভ কেবল ইরানেই নয়, বিশ্বের যেকোনো জায়গাতেই টেকা মুশকিল।’

ইরানি কর্তৃপক্ষের এমন বিক্ষোভ দমনের একাধিক অভিজ্ঞতা আছে। একাধিকবার তারা এই কাজে সফলতা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর শুরু হওয়া গ্রিন মুভমেন্ট এবং ২০২২ সালে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন।

দেশটির সরকার এই বিক্ষোভেও ‘ঘি ঢালার’ অভিযোগ তুলেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। অবশ্য, সেই অভিযোগকে পোক্ত করেছে অভিযুক্তরাই।

সম্প্রতি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানসহ ইরানজুড়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ বলেছে, তারা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ‘মাঠেই আছে’।

এমনকি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বলেছেন, শিগগির ইরানের ‘স্বৈরাচারের’ পতন হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, ইরান ‘চরম সংকটে’ রয়েছে এবং প্রয়োজনে তিনি সামরিক হামলার নির্দেশ দিতে পারেন।

মঙ্গলবার তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের ‘দেশপ্রেমিক’ সম্বোধন করে বলেছেন, ‘প্রতিবাদ চালিয়ে যাও, তোমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করো!!! খুনি ও নির্যাতনকারীদের নাম সংরক্ষণ করো।’

সবমিলিয়ে ইরানে সরকার পরিবর্তনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইরানের পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিছু দেশের সরকার বিদেশি উসকানিতে ইরানে সৃষ্ট দাঙ্গা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, আর বাকিরা বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘তেহরানের সহিংস প্রতিক্রিয়া’র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে জীবনযাত্রার মানের অবনতি ও মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদেই ইরানে এই বিক্ষোভের শুরু। ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন।

তবে, তারা ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ এবং ‘দাঙ্গাবাজ’দের আলাদা করে দেখছেন। তাদের মতে, সাধারণ মানুষের ক্ষুব্ধতাকে সরকার বদলানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এলহাম কাদখোদাই আলা জাজিরাকে বলেন, ‘(ইরানের) মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে থাকলেও তারা এটা বোঝেন যে এই সমস্যাটা মূলত নিরাপত্তা ইস্যু।’

ইরান সরকারের পক্ষে সম্প্রতি যে বিক্ষোভ হয়েছে, সেটাকে ‘দেশ’ ও ‘নিরাপত্তা বাহিনী’র প্রতি সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইরানে মার্কিন সামরিক হামলার হুমকি ‘কয়েক মাস আগে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধ আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতা’।

‘ইরানে একটি অনুভূতি রয়েছে যে যত কষ্টই আসুক না কেন, আমরা সব সময় দেশ ও দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় দাঁড়াব,’ যোগ করেন তিনি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বে সম্প্রতি সরকারের পক্ষে হওয়া বিরাট বিক্ষোভের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সরকার শিগগির ইন্টারনেট সেবা চালু করে দেবে। কিন্তু, সেটা ঠিক কবে নাগাদ হতে পারে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু জানাননি তিনি।

ইরান সরকারের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে, নাগরিকদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তারা বুঝতে পারছে, কিন্তু কোনো অস্থিরতা সহ্য করবে না।

ইন্টারনেটবিহীন ইরান থেকে এখন যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাতে বিদেশি হস্তক্ষেপ না ঘটলে এবারও ইরান এই বিক্ষোভ দমন করতে সক্ষম হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিস্থিতি বদলেও দিতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আজ আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আবারও বলেছেন, আলোচনার পথ খোলা থাকলেও যুদ্ধের জন্য তারা প্রস্তুত। এমনকি তাদের প্রস্তুতি সর্বশেষ ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের চেয়েও বেশি।

ইরানের সেনাপ্রধান জেনারেল আমির হাতামিও বলেছেন, ১২ দিনের ওই যুদ্ধের চেয়ে আরও বেশি প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।

 

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ