
রাজশাহী ব্যুরো: ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করতে গভীর চক্রান্ত চলছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ প্রশাসনসহ সকল সেক্টরে ঘাপটি মেরে থেকে দেশকে অকার্যকর ও অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। এমন এক সেক্টর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড রাজশাহী অফিস।
এই শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক অলীউল আলম ও সচিব হুমায়ুন কবীর জুয়েল আওয়ামী ফ্যাসিবাদ সরকারের আমলে যেই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে ঠিক সেই ভাবে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ সরকার পতনের পরেও তারা বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
৫ আগস্ট বিপ্লবের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা অবিলম্বে এসব আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের প্রত্যাহারের অন্তর্র্বতী সরকারের প্রতি আল্টিমেটাম দিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় ৩ মাসেও দাবি পূরণ না হওয়ায় এখনো স্ব স্ব পদে বহাল থাকায় বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে।ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-শিক্ষক-জনতা। যার ফলে নানা আলোচনার কেন্দ্রস্থল এখন এই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড রাজশাহী অফিস।
জানা যায়,২০২২ সালের ৪জানুয়ারি হুমায়ুন কবীর জুয়েলকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সচিব হিসাবে নিয়োগ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। আর ২০২৩ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সে সময়ের উপসচিব (কলেজ-২) চৌধুরী সামিয়া ইয়াসমীন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে প্রফেসর ড. মো. অলীউল আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এদিন বিকেলে তিনি শিক্ষা বোর্ডে চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন।
পর পর দুই চেয়ারম্যানের আমলেই আওয়ামী ফ্যাসিবাদ সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে সচিব হুমায়ুন কবীর জুয়েল। সরকারি চাকরিজীবী হয়েও তারা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডকে আওয়ামী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিলেন তারা। এমনকি শিক্ষা বোর্ডের টাকায় করেছেন টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত, শহীদ কামারুজ্জামানের সমাধিতে পুস্পস্তবক অর্পণ ও জিয়ারত, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ বার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস উদযাপন থেকে শুরু করে আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের নানা কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন।
গত ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদের ডামি নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের পক্ষে মিছিল মিটিং ও ভোট করতেও দ্বিধা করেননি এসব চাকরিজীবীরা। নিজেদের চেয়ার ধরে রাখতে প্রেষণে বোর্ডে আসা শিক্ষা ক্যাডারের এসব কর্মকর্তারা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে স্বেচ্ছায় আওয়ামী লীগার হয়ে উঠেছিলেন।
আওয়ামী ঘরনার শিক্ষক,অভিভাবক,ঠিকাদার,সাংবাদিক ছাড়া কারোর প্রবেশাধিকার ছিল না চেয়ারম্যান ও সচিবের কক্ষে।
শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞাপন প্রদানের ক্ষেত্রেও তারা চালু করেন আওয়ামী সেন্সরশিপ। ভিন্নমত পোষণকারী কোনো পত্রিকায় শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞাপন দেয়ার ওপর তারা অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
২০২৪ সালে টুঙ্গিপাড়া গ্রাম নিয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ টুঙ্গিপাড়া গ্রাম ও প্রকাশনা পায়।
রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডে কর্মরতরা জানান,১লা আগস্ট ২০২৪ রোববার আওয়ামী ফ্যাসিবাদ সরকারের শোকের মাসের প্রথম দিনের শুরুতেই রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান সকলস্তরের কর্মকর্তা,কমর্চারীদেরকে কালোব্যাচ পরিয়ে কর্মদিবস শুরু করেছিলেন। এরপর চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. অলীউল আলম ও সচিব মো. হুমায়ূন কবীরের নেতৃত্বে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড চত্বরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়েছিলো।
এছাড়াও বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল এর ৭৫ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি সভা ও ৫আগষ্ট তা পালানে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু মুড়াল চত্বরে বোর্ডের সকল কর্মকর্তা কর্মচারীকে উপস্থিত হয়ে বঙ্গবন্ধু ও শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামালের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে শিক্ষা বোর্ডের হলরুমে আলোচনা সভা ও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড জামে মসজিদে বঙ্গবন্ধু ও শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল এবং তার পরিবারের শহীদ সদস্যদের মাগফেরাত কামনায় মিলাদ মাহফিল আয়োজন করে চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. অলীউল আলমের নির্দেশে সচিব মো. হুমায়ূন কবীর নোটিশ জারি করেছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে প্রতিদিনের ভ্যান ভাড়াসহ বোর্ডের বিভিন্ন কাজের বিপরীতে ভুয়া বিল-ভাউচারসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড রাজশাহী সহকারী সচিব (স্টুয়ার্ড শাখার দায়িত্ব) প্রাপ্ত মো: আওলাদ হোসেন খান ও একান্ত সচিব মো: হাসান আলীর মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার নয়ছয় করে এখনো শিক্ষা বোর্ডকে চুষে খাচ্ছে চেয়াম্যান অধ্যাপক অলীউল আলম ও সচিব হুমায়ুন কবীর জুয়েল।
এরই মধ্যে সাউথ ইষ্ট ব্যাংক রাজশাহী শাখায় চেয়াম্যান অধ্যাপক অলীউল আলম তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে দুই কোটি টাকা জমা করেছে বলেও অভিযোগ করেন রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের কর্মরতরা।
তারা বলেন এখানেই শেষ নয় আওয়ামী ফ্যাসিবাদ প্রশাসন চেয়ারম্যান ও সচিব সিন্ডিকেটের রাম রাজত্য।
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড রাজশাহীকে ধ্বংস করতে সোনালী ব্যাংক রাজশাহী শাখায় শিক্ষা বোর্ডের অ্যাকাউন্টে ডিপোজিট করার জন্য গচ্ছিত বিশ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় ভাবে নিষেধ থাকলেও একটি বেসরকারি ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য উপ-পরিচালক ( হিঃ ও নিঃ) মো: নুরুল ইসলাম খাঁনকে চেয়াম্যান অধ্যাপক অলীউল আলম ও সচিব হুমায়ুন কবীর জুয়েল চাপ দিচ্ছেন যা নিয়ে সচিব হুমায়ুন কবীর জুয়েল ও উপ-পরিচালক ( হিঃ ও নিঃ) মো: নুরুল ইসলাম খাঁনকে বাকবিতন্ডায় জড়াতেও দেখা গেছে বলে জানান তারা।
তবে এ বিষয়ে উপ-পরিচালক ( হিঃ ও নিঃ) মো: নুরুল ইসলাম খাঁনকে কয়েক বার ফোন করলেও তিনি তা রিসিভ না করায় তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগেও সচিব হুমায়ুন কবীর জুয়েলকে নিয়ে বার বার অস্বস্তিতে পড়েছেন বোর্ডের কর্মকর্তা কর্মচারীরা।
এছাড়াও অবৈধভাবে বিভিন্ন স্কুল কলেজ পরিদর্শন করা নিয়েও শিক্ষা বোর্ডে বিতর্কে পরেন তিনি। একাধিক মেয়ের সাথে রয়েছে এই সচিবের অনৈতিক কর্মকান্ড। এমনকি স্বামীর সংসারও ছাড়তে হয়েছে অনেক মেয়েকে। এমনই এক নারীর সাথে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কথাকোপনের প্রমানাদী এসেছে সাংবাদিকদের হাতে। সেই নারীর নাম নিগার ফারজানা।
তিনি জিএম হাফিজ মাহমুদের স্ত্রী বলে জানা গেছে। এই সচিব কয়েক বছর আগে রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক থাকাকালে পরকীয়ার কারণে স্ত্রীকে নির্যাতন করেন হুমায়ুন কবীর জুয়েল।
স্ত্রীর করা মামলায় দীর্ঘ দিন কারাগারে ছিলেন তিনি। এ কারণে সেসময় তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়। পরে স্ত্রীর সঙ্গে আপস করে মামলা থেকে নিষ্কৃতি পান। ফিরে পান চাকরি।
শাস্তিমূলকভাবে রাজশাহী থেকে তাকে বদলি করা হয়েছিল ফেনীর সোনাগাজী সরকারি কলেজে। ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি হুমায়ুন কবীর জুয়েলকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সচিব হিসাবে নিয়োগ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চ শিক্ষা বিভাগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কর্মচারীরা জানান,প্রতিনিয়ত তার কক্ষে যুবতী মেয়েদের আনাগোনা লেগে থাকে। অনেক সময় তাদের সাথে নিয়েই বেরিয়ে পরতেন অফিস থেকে। যা আমাদের সকলেই জানে।
শিক্ষা বোর্ড কর্মচারী সমিতির নেতৃবৃন্দরা বলেন,বিগত দিনে বিভিন্ন সময়ে প্রেষণে আসা শিক্ষা ক্যাডারের দলকানা কর্মকর্তারা বোর্ডকে দলীয়করণের মাধ্যমে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছিলেন।
ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে এসব আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা ভোল পাল্টে চেয়ার রক্ষার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সেই সব অতি উৎসাহী আওয়ামী লীগারদের অনেকেই রাতারাতি জাতীয়তাবাদী বা ইসলামী মূল্যবোধ ও আদর্শের লোক হওয়ার দৌড় শুরু করেছেন। আমরা যারা দীর্ঘদিন নিপীড়িত,নির্যাতিত তারা চাই অবিলম্বে এসব আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের বোর্ড থেকে অপসারণ করা হোক। এর পাশাপাশি বোর্ডের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সেকশনে ও পদে যারা দীর্ঘদিন বসে আছেন তাদেরও আভ্যন্তরীণ বদলির মাধ্যমে বৈষম্য দূর করাসহ বোর্ডকে কলঙ্ক মুক্ত করতে বোর্ড চেয়ারম্যান ও সচিবসহ যারা এখনো চেয়ারে বসে আছেন তাদের অপসারণের কোনো বিকল্প নেই বলে জানান তারা।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সচিব হুমায়ুন কবীর জুয়েলের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, আমি একজন হুকুমের গোলাম। বোর্ড চেয়ারম্যান স্যার আমাকে যা আদেশ দেন তা আমি পালন করি। তিনি যে সকল বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেন সেগুলোতো আমাকে নেয়া লাগবে। তবে আমি কোন অনিয়মের সাথে জড়িত না।
এমন সব অভিযোগ বিষয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান ও সচিব হুমায়ুন কবীর জুয়েলসহ তাদের সিন্ডিকেট এর আরও তথ্য নিয়ে আসছি আগামী পর্বে।











