শুক্রবার, ২১শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ,৪ঠা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

কিশোর গ্যাং একটি সামাজিক সমস্যা : মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম

মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম: কিশোর গ্যাং বর্তমান সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। শিশু ও কিশোরদের একটি বড় অংশ এখন গ্যাং কালচারের সাথে যুক্ত। রাজধানী ঢাকা শহর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা শহর পর্যন্ত এর পরিধি ও বিস্তৃতি ঘটেছে। ক্রমেই বেপরোয়া গয়ে উঠছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। সামাজিক অবক্ষয়, সমাজ পরিবর্তন, সমাজের নানাবিধ অসঙ্গতি এবং অস্বাভাবিকতায় কিশোর গ্যাং কালচারের সাথে জড়িয়ে পড়ছে শিশু ও কিশোররা।

২০১৭ সালে রাজধানী ঢাকার উত্তরায় ডিসকো বয়েজ ও নাইন স্টার গ্রুপের মধ্যে বিরোধের জেরে খুন হয় ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির। এই মামালার তদন্তকালে বেরিয়ে আসে কিশোর গ্যাং কালচার এবং তাদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের ভয়ঙ্কর সব ঘটনার কথা। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে।

গোয়েন্দা তথ্যমতে, দেশজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের দুই শতাধিক গ্রুপ সক্রিয়। এদের মধ্যে ছোটবড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক গ্যাংয়ের তৎপরতা দৃশ্যমান। পুলিশের ক্রাইম অ্যানালাইসিস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী রাজধানী ঢাকাতেই গত কয়েকবছরে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সন্ধান মিলেছে অন্তত ৫০ টি। এগুলোর মধ্যে ১. কাকড়া গ্রুপ, ২. জি ইউনিট গ্রুপ, ৩. ব্লাক রোজ গ্রুপ, ৪.রনো গ্রুপ, ৫. কে নাইট গ্রুপ , ৬. ফিফটিন গ্রুপ, ৭. ডিসকো বয়েজ গ্রুপ, ৮. নাইট স্টার গ্রুপ, ৯. নাইন এম.এম বয়েজ গ্রুপ,১০. পোটলা বাবু , ১১. সুজন গ্রুপ,
১২. আলতাফ গ্রুপ, ১৩. ক্যাসল গ্রুপ, ১৪. ভাইপার গ্রুপ , ১৫. পাটোয়ারী গ্রুপ, ১৬.আতঙ্ক গ্রুপ, ১৭. চাপায় দে গ্রুপ , ১৮. ফিল্ম ঝিরঝির গ্রুপ, ১৯. এফএইচবি গ্রুপ, ২০. কেনাইন গ্রুপ, ২১. তুফান থ্রি গ্রুপ, ২২. স্টার বন্ড গ্রুপ, ২৩. জুম্মন গ্রুপ, ২৪. চান্দ-যাদু জমজ ভাই গ্রুপ, ২৫. গ্রুপ টোয়েন্টি ফাইভ থেকে লেবেল হাট, ২৬. দেখে- ল চিনে- ল গ্রুপ, ২৭. কোপাইয়া দে গ্রুপ, ২৮. ডেভিল কিং ফুল পার্টি,২৯. ভলিয়ম টু ভান্ডারি, ৩০. বয়েজ উত্তরা, ৩১. পাওয়ার বয়েজ উত্তরা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে অভিজাত এলাকাগুলোতে এদের তৎপরতা বেশি। ঢাকার বাইরেও কিশোর গ্যাংয়ের একাধিক গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। ১৫- ২০ বছর বয়সি কিশোর গ্যাংয়ের প্রতিটি গ্রুপে ১০ থেকে ২০ জন সদস্য থাকে। কিশোর গ্যাংদের চলাফেরা, পোশাক-পরিচ্ছদ, চুলের স্টাইল সব আলাদা ধরনের। কখনও স্পাইক করা আবার কখনও পেছনে ঝুঁটি বাঁধা। হাতে ব্যান্ড,গলায় চেইন। এরা বড়ভাইদের হাতের পুতুল। বড়ভাইদের ইশারায় ভালোমন্দ বিবেচনা না করে এরা কাজ করে থাকে। গ্যাং
তৈরি হওয়ার পর খুব দ্রুতই অন্য এলাকার গ্রুপগুলোর সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়।

কোনো শিশু অপরাধী হিসেবে জন্মায়না। বরং সে নিস্পাপ হিসেবে জন্মায়। পরিবেশ, পরিস্হিতি, পারিপার্শ্বিকতা, পিতা-মাতার আচরন, আর্থ সামাজিক পরিবর্তন, আকাশ সংস্কৃতি ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার, অল্পবয়সে মোবাইল ফোনে আসক্তি, দেশি-বিদেশি টেলিভিশনে অপরাধবিষয়ক নানা অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, দুর্বল পারিবারিক বন্ধন, যৌথ পরিবারের ভাঙন, পারিবারিক শৃংখলার ঘাটতি ইত্যাদি কারনে শিশুদের মধ্যে অপরাধ প্রবনতা দেখা দেয়।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে পাড়া বা মহল্লা এবং এলাকাভিত্তিক নানারকম অপরাধকান্ডে। এই কিশোরেরা সমাজের মধ্যে আলাদাভাবে নিজেদের মতো করে এক ভিন্ন সমাজ গড়ে তুলছে।

দ্রুত হিরো হওয়ার মোহ, ক্ষমতা, বয়সের অপরিপক্কতা, অর্থলোভ, বিনাকষ্টে প্রতিষ্ঠা, মোটর সাইকেল চালানো, সালাম পাওয়া, গার্লফ্রেন্ডদের কাছে হিরো হওয়া, ত্রুটিপূর্ন পরিবার, অপরাধ প্রবন এলাকায় বসবাস, অসৎসঙ্গ, বিনোদনের অভাব,অশ্লীল ছবি দেখা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, স্হানচ্যুতি, পিতা-মাতার খারাপ আচরন, মোবাইল ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার, পারিবারিক নেতিবাচক ঘটনা, সামাজিক প্রতিকুল পরিস্থিতি কিশোরদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশে দারুনভাবে প্রভাব ফেলে। যার ফলস্রুতিতে কিশোররা সমাজের বিভিন্ন গ্যাং কালচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে।

আর্থিক অসংগতি এবং দৈন্যতাও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হওয়ার জন্য কার্যকরী ভুমিকা পালন করে। অস্বচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারের শিশু – কিশোররা সাধারণত অপরাধ প্রবন হয়ে থাকে। নিগৃহ,অবজ্ঞা ও অবহেলা কিশোর অপরাধী সৃষ্টির অন্যতম কারন। অবহেলিত উদ্বাস্তু সমাজ এবং ভাঙা সংসার কিশোর অপরাধী সৃষ্টির সহায়ক। বিবাহ- বিচ্ছেদ, মাতা-পিতার পৃথক অবস্থান, পরিত্যাক্ত স্বামী -স্ত্রী, মাতাপিতার পৃথক সংসার ও বসবাস কিশোর অপরাধী সৃষ্টির অন্যতম কারন। কিশোররা সাধারণত অপরাধী পিতার অনুগামী হয় ও তার কাজকর্ম অনুসরণ করে। অবৈধ সন্তানেরা বা পিতৃ-মাতৃহীন সন্তানরা প্রায়ই নিজেদেরকে ঘৃনিত মনে করে অপরাধী হয়ে ওঠে।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্হানে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা চুরি, ছিনতাই, পাড়া বা মহল্লার রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে মোটর সাইকেল চালিয়ে মহড়া, মাদক সেবন ও বিক্রি, মাদক ব্যবসা ও পাচার, চাঁদাবাজি, মেয়েদের উত্যক্ত ও ইভটিজিং, রাস্তায় জটলা করা, দলবেঁধে অশালীন মন্তব্য করা, মেয়েদের স্কুল, কলেজের সামনে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা, প্রকাশ্য অস্ত্র উঁচিয়ে হুমকি-ধমকি, বড়দের অসম্মান করে কথা বলা, মেয়েলি বিষয় নিয়ে সিনিয়র – জুনিয়র দ্বন্ধ, কাউকে গালি দিলে, যথাযথ সন্মান না দেখালে, এমনকি বাঁকা চোখে তাকানোর কারনেও মারামারির ঘটনা ঘটে।এলাকা ও খেলার মাঠে আধিপত্য বিস্তার, ধর্ষন,অপহরণ, মারামারি, খুন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। অনেক সময় তুচ্ছ কারনেও মারামারি এবং কখনও খুনের ঘটনা পর্যন্ত ঘটে থাকে। মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হওয়ায় পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা গ্রুপকে কাজে লাগিয়ে টাকা আদায় করে। ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত হয়।

কিশোর গ্যাং সমস্যা নিরসনে দরকার সর্বসম্মতিক্রমে সামাজিক আন্দোলন। কিশোরদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিয়ে তাদের নিয়মিত কাউন্সিলিং করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রতিটি পরিবারকে সহনশীল হয়ে গঠনমূলক কাজ করতে হবে। পরিবারে পরস্পরের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। পারিবারিক বন্ধন জোরদার করে পারিবারিক আড্ডার ব্যবস্হা করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মানসিক ও বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশে অভিভাবকদের যত্নবান হতে হবে।ছেলে – মেয়েরা কার সাথে মিশছে, স্কুল-কলেজে ঠিকমতো যায় কিনা, কিভাবে বড় হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে। আচরনের ক্ষেত্রে শিশু-কিশোর দের ওপর খুবই কঠোর আবার একেবারেই শিথিল হওয়া যাবেনা। প্রয়োজনে ক্ষেত্র বিশেষে তাদেরকে শাসন এবং সোহাগ করতে হবে। পরিবারের সাথে সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নৈতিক ও মানবিক মুল্যবোধে কিশোরদের গড়ে তুলতে হবে। কিশোর গ্যাং এলাকাগুলো চিহ্নিত করে জড়িতদের এবং বড়ভাইদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে কিশোর গ্যাং সদস্যদের শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনই লক্ষ্য হওয়া উচিত।

সমাজে যাতে কিশোর গ্যাং সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কারন আজকের শিশু-কিশোররাই আগামি দিনের ভবিষ্যত।তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার নৈতিক দায়িত্ব আপনার, আমার সবার ওপর বর্তায়।

লেখক ও কলামিস্ট: মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম
পুলিশ ও র‍্যাব কর্মকর্তা অবঃ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ