শুক্রবার, ১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ,২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

ঝালমুড়িতে চলে ভাত ও পাঠ

আবু শামা, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়: মা কেমন আছো? ভাত খেয়েছো? বাবা বাড়িতে তো একমুঠো চাউল ও নেই। আমার হাঁটুর ব্যথাটাও বেড়েছে। বাড়ি আসবি কবে বাবা? একথা শুনে চোখের বন্যা বয়ে পদ্মা নদীর তীর ভেঙে পড়ার অবস্থা।
কি গল্প মনে হচ্ছে? না, না, বাস্তব জীবনের গল্প শুনালেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষার্থী আব্বাসউদ্দীন।

ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় মেধার সাক্ষর রেখেছে আব্বাস। কিন্তু সে সোনার চামচ নিয়ে জন্ম গ্রহন করে নাই, আর্থিক টানাপোড়েন ছিল তার নিত্য সঙ্গী । ১৪ বছর বয়সে বাবাকে  হারানোর পর অথৈয় সাগরে নিমজ্জিত ।একদিকে বাবা হারানোর যন্ত্রণা  অন্যদিকে পড়াশুনা চালিয়ে নেওয়া প্রবল আগ্রহ। তখনি তার পাশে দাড়াঁয় বড় ভাই আক্কাস উদ্দিন। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবে বড় ভাইয়ের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে ফের দুঃখ দুর্দশা নেমে আসে তার জীবনে। তখন থেকেই আর্থিক সংকটকে সাথে নিয়ে পার হচ্ছে  দিন । অদম্য আব্বাস কখনো নির্মাণ শ্রমিক, কখনোই বা  দর্জির কাজ করে সংসার টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু করেছেন তিনি।

তিন ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট আব্বাস। ভাই আক্কাস ও বোন ফাতেমার বিয়ে হয়ে গেলে মা শাহানারা বেগমকে নিয়ে একাই সংসার চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময় থেকে চাকুরি করে নিজের পরিবারের পাশে দাড়াঁন তিনি। দর্জি, রাজমিস্ত্রির সহকারী, ভিডিও ফটোগ্রাফীসহ নানা কাজ করতে হয় থাকে। তবে পাশাপাশি পড়াশুনার অদম্য আগ্রহ তাকেঁ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই ছোট্ট একটি বাসায় মাকে নিয়ে বসবাস করেন আব্বাস। সম্প্রতি সংসারের টানাপোড়ন নিয়ে চিন্তার ভাজ পড়ে আব্বাসের কপালে। তখনি মাথায় আসে ক্যাম্পাসের সামনে ঝালমুড়ি বিক্রির। পড়াশুনার পাশাপাশি ঝালমুড়ি বিক্রি করে নিজের পড়াশুনা ও সংসার চালাতে হচ্ছে বলে জানান আব্বাস। তিনি বলেন, ক্লাস শেষ হওয়ার পর যতটুকু সময় পাই সেই সময়টাতে বিক্রি করি। বেচা-কেনা শেষ  করে বাসায় যেতে প্রায় রাত ১০টা বেজে যায়। সারাদিনের ক্লান্তিতে সহজে ঘুম চলে আসে তবে রাত ৪টা থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত একাডেমিক পড়াশোনা শেষ করার চেষ্টা করি।

আব্বাস নুরুল উলুম ইদ্রিসিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ৪.১৭ পেয়ে দাখিল পাশ করেন। পরবর্তীতে কলেজে ভর্তি হয় এবং টাকার অভাবে কোচিং করতে না পারায়  এইস এস সি পরিক্ষায় ইংরেজীতে অকৃতকার্য ও হয় সে। তবে হতাশার কাছে হার মানে নি আব্বাসের ইচ্ছে শক্তি আর একাগ্রতা।
পরবর্তী নানুপুর লায়লা কবির ডিগ্রি কলেজ থেকে ৩.৬৭ পেয়ে এইসএসসি পরিক্ষা উত্তীর্ণ হয়।

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ভাল ফলাফল না করলেও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার স্বপ্ন ছিল স্কুল জীবন থেকে। ভর্তির পরিক্ষার  কোচিং করার সুযোগ হয় নি । বন্ধুদের কাছ থেকেই বই  ধার করে নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখলেন।কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা উক্তি ” বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”সত্য হিসাবে আবার প্রমাণ করলেন আব্বাস, তার কাজে সবসময় সাহস জুগিয়েছে খালাতো বোন জান্নাত।

এইচএসসিতে প্রথমবার ইংরেজিতে কৃতকার্য হতে না পারা আব্বাস ভর্তি পরীক্ষায় সেই ইংরেজিতে ৩০ মার্কের মধ্য ২৫ পেয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়। আর্থিক অনটনের কারণে কয়েকটি মেধাবৃত্তি পেলেও শর্ত সাপেক্ষ হওয়ায় নিতে পারেনি তিনি। তবে সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) প্রস্তুতির পাশাপাশি বিদেশে পড়তে চান আব্বাস।

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে পড়লে বিসিএসের পাশাপাশি বিদেশে উচ্চতর শিক্ষার জন্য প্রায় ১৬টি ডিগ্রির সুযোগ রয়েছে। ফ্রি  অথবা ৫০% স্কলারশিপের সুযোগ পেলে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের জন্য বিদেশে চলে যাব। তার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। নিজস্ব সম্পত্তি না থাকায় এখন থেকেই কিছু একটা করার চেষ্টা করছি। তাছাড়া পরিবারে আয় করার মতো মানুষ নেই। আমি কার উপর নির্ভর করব? জন্ম থেকেই পরিবারের যতটুকু সামর্থ্য ছিল ততটুকু দিয়ে বড় করেছেন। এখনও পরিবারের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকাটা নিজের কাছে বোঝা মনে হচ্ছে।

তার মা শাহানার বেগম ছেলের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে কেদেঁ বলেন,পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতেই আমার ছেলে ঝালমুড়ির দোকান দিয়েছে। ছেলে সারাদিন খাটাখাটনি করে যতটুকু উপার্জন করেন তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে। তাছাড়া ক্যাম্পাসের বাহিরে রোদ-বৃষ্টির ঝড়-ঝাপটায় নানান  সমস্যা পোহাতে হয় তার(আব্বাস)। তবে ক্যাম্পাসের ভিতরে হলে আরও নিরাপদ ও সুবিধা হতো বলে মনে করেন তিনি।

আব্বাস দুংখ প্রকাশ করে আরও বলেন, সুনির্দিষ্ট বসার মতো কোথাও জায়গা পাচ্ছি না, যার কারনে যখন যেখানে জায়গা পাই সেখানে বসে দোকান চালিয়ে নিই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা পেলে ব্যবসার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চালিয়ে নিতে সহজ হতো।
আব্বাসের ঝালমুড়ি খেতে বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি ভীড় লেগে থাকে শিক্ষার্থীদের। তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র এভাবে ঝালমুড়ি বিক্রি করতে পারে সেটাই কল্পনাতীত। তার জীবন সংগ্রামের অদম্য সাহস আমাদের মুগ্ধ করছে। তার ঝালমুড়ি কেমন হচ্ছে সেটি বিষয় নয়, সে আমাদের ক্যাম্পাসের। আমরা এজন্য এখানে খেতে আসি। এসময় অনেকে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে আব্বাস বসতে দেয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহ. আমিনুল ইসলাম আকন্দ বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা পূর্ব থেকে অবগত আছি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে আমরা সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি, তার নাম আমাদের নোটবুকে আছে। এছাড়াও ভবিষ্যৎ সুযোগ পেলে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করতে চাই।

সুনির্দিষ্ট স্থানে আব্বাসের দোকানের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের রিসোর্স সীমিত থাকার কারনে আমরা কোনো কিছু করতে পারছি না। বিষয়টা সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যে পড়ে। এ বিষয় নিয়ে আমরা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলব।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ