বৃহস্পতিবার, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ,২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

তাড়াশ পৌরসভার কোটি টাকা ‘উধাও’, প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ অস্তিত্বহীন

সাইদুল ইসলাম আবির, নিজস্ব প্রতিবেদক:  সিরাজগঞ্জের তাড়াশ পৌরসভা–এর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার অধিকাংশ কাজ বাস্তবে হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে পৌর প্রকৌশলী মো. মুকুল হোসেন ও স্থানীয় ঠিকাদার এস এস এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী সোহাগ রাণার বিরুদ্ধে। নথিতে লিপিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের অধিকাংশের অস্তিত্ব নেই, দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পৌরবাসীরা।

‘আমরাও আছি পাশে’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠনের করা জরিপেও তাড়াশ পৌরসভার অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, নূন্যতম নাগরিক সেবাও পৌরবাসীদের পর্যাপ্তভাবে দেওয়া হয়নি।

প্রসঙ্গত, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাড়াশ পৌরসভার মেয়রের পদ বাতিল করা হয় এবং প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই সুযোগে পৌর প্রকৌশলী মো. মুকুল হোসেন স্বল্প পরিচিত পত্রিকায় পৌরসভার রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহবান করেন। পরে ঠিকাদার সোহাগ রাণার সঙ্গে যোগসাজেশে সব প্যাকেজের কাজ এস এস এন্টারপ্রাইজকে পেতে সহায়তা করা হয়।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের বৃহত্তর পাবনা ও বগুড়া জেলা নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তাড়াশ পৌরসভার উন্নয়নের জন্য ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

পৌরসভার নাগরিকরা অভিযোগ করেছেন, পৌরসভা তৈরি হওয়া ৯ বছরে কোথাও ড্রেন নির্মাণ হয়নি। বৃষ্টিতে রাস্তা তলিয়ে গিয়ে দোকানের মধ্যে পানি ঢুকে পড়ছে। শিউলি মেশিনারিজ দোকানের মালিক মো. শাজাহান আলী বলেন, ময়লা-আবর্জনা ঠিকমতো ব্যবস্থাপনা না হওয়ায় দুর্গন্ধ ও মশা-মাছি সমস্যা বাড়ছে।

সার্ভে ও সরেজমিন তদন্তে দেখা গেছে, পৌর এলাকার কোথাও ড্রেন নির্মাণ হয়নি। পৌর শহরের বেশ কয়েকটি রাস্তা বছর না যেতেই ভেঙে যাচ্ছে। তাড়াশ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তাটুকু সংস্কার হয়নি। কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ ও শহরের বাজারের সামনে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে আছে।

উপজেলা নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক রাজু বলেন, “২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর গ শ্রেণির তাড়াশ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পরও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। খেলার মাঠ, বিনোদন কেন্দ্র, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি-গ্যারেজ বা অটোভ্যান গ্যারেজের কোনো ব্যবস্থা নেই। নিয়মিত কর পরিশোধের পরও কাঙ্খিত সেবা পাইনি।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ও সিরাজগঞ্জ জেলার ঠিকাদারদের তথ্য অনুযায়ী, ৫টি প্যাকেজে ভাগ করা ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কাজের দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রকৌশলী মো. মুকুল হোসেন স্বচ্ছভাবে ব্যয় বণ্টন প্রকাশ না করে নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেন। ফলে সব কাজই এস এস এন্টারপ্রাইজের অধীনে গিয়েছে।

ঠিকাদার সোহাগ রাণার দাবি, তিনি সাইনবোর্ড দিয়ে জানিয়েছিলেন কোন কাজ করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পৌর এলাকা ঘুরে কোথাও রাস্তা বা ড্রেনের সাইনবোর্ড পাওয়া যায়নি। তিনি প্রতিবেদককে সংবাদ প্রকাশ না করার অনৈতিক প্রস্তাবও দিয়েছেন।

পৌর প্রশাসক নুসরাত জাহান বলেন, “প্যাকেজ অনুযায়ী কতটুকু রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের কথা ছিল, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, “প্রতিবেদন পেয়েছি ও পড়েছি। সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রকৌশলী মো. মুকুল হোসেন ও ঠিকাদার সোহাগ রাণার দুর্নীতির যথাযথ তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আশু হস্তক্ষেপ করবে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ