রবিবার, ১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ,১লা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিয়েছেন খামেনি

যায়যায়কাল ডেস্ক: ইরানে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন। সেই যুদ্ধে দশ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হন এবং ইরানের অর্থনীতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

নব্বইয়ের দশকে ইরানের জন্য বিনিয়োগ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। ততদিনে ইসলামি বিপ্লবের উদ্দীপনা কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসছে। যুদ্ধের ক্লান্তিতে পিষ্ট অনেকে ইরানকে পুনরায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মূলধারায় ফিরে আসতে দেখতে আগ্রহী ছিল। এই জনমত ১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থী মোহাম্মদ খাতামির ভূমিধস নির্বাচনী বিজয়ে রূপ নেয়।

খাতামি ছিলেন পশ্চিমের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোক্তা। তা সত্ত্বেও পশ্চিমের প্রতি খামেনির নিজস্ব সংশয় এবং অবিশ্বাস অটল ছিল। তিনি সংস্কারের পক্ষে জনমতকে—এমনকি সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর ভেতর থেকেও—বিদ্যমান ব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে দেখতেন।

‘ইরান ফ্রেমড’-এর লেখক বাজোগলি বলেন, ‘খোমেনির তুলনায় খামেনির নিজের কোনো স্বাভাবিক জনভিত্তি ছিল না। তাই তিনি আধা-সামরিক ব্যবস্থার মধ্যে থাকা তরুণ প্রজন্মের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পুনর্গঠনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন, যেন তারা পরবর্তীতে নেতৃত্বে উঠে আসতে পারে।’

এর অর্থ ছিল আইআরজিসিকে ব্যবসার একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া, যা তাদের ইরানের অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তারে সাহায্য করবে। একইসঙ্গে তার আধা-সামরিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী ‘বাসিজে’র তরুণ সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আরও জোরদার করা হয়।

২০০৯ সালে পশ্চিমের কট্টর বিরোধী মাহমুদ আহমাদিনেজাদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিজয়ের পর যে দেশব্যাপী বিক্ষোভ শুরু হয়, তা দমনে আধা-সামরিক বাহিনীর এই নতুন সদস্যদেরই ডাকা হয়েছিল। তখন নতুন প্রজন্ম বিপ্লবকে অনুপ্রাণিত করা আগের প্রজন্মের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বা উপনিবেশবাদ-বিরোধী সেই আদর্শের সঙ্গে খুব একটা সম্পৃক্ত ছিল না।

খামেনির নেতৃত্বের জন্য তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত ওই আন্দোলনে লাখ লাখ বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসেন। গণমাধ্যম একে ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ বা সবুজ আন্দোলন হিসেবে আখ্যা দেয়। তারা নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে এবং পরাজিত সংস্কারপন্থী প্রার্থী মীর হোসেন মুসাভির প্রতি সমর্থন জানায়।

বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন, আহমাদিনেজাদকে জেতানোর জন্য নির্বাচনে কারচুপি করা হয়েছে, তবে খামেনি সেই ফলাফলকেই সমর্থন করেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, সে সময় হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ডজনখানেক বিক্ষোভকারী নিহত হন। ইরানি নেতৃত্ব সে সময় অভিযোগ করেছিল যে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পশ্চিমা দেশগুলো এই অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে।

২০১৫ সালে পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে মারাত্মক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে দেশ যখন ধুঁকছিল, তখন অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং বৈধতা বাড়াতে খামেনি অর্থনৈতিক চাপ কমানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

তাই তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে পশ্চিমের আলোচনার সবুজ সংকেত দেন, ফলে ২০১৫ সালের ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ স্বাক্ষরিত হয়। ইরান এবং বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে সই হওয়া এই ঐতিহাসিক চুক্তি তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।

কিন্তু সেই চুক্তি সইয়ের তিন বছর পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন, যা সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টায় ইতি টানে। ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নতুন করে একগুচ্ছ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর খামেনি আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানে ফিরে আসেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা বর্জন করেন এবং চুক্তির শর্তগুলো ধীরে ধীরে ভঙ্গ করার প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানান।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০১৯ সালে সরকারের পেট্রোলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পর ইরানজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দমনে নৃশংসতার অভিযোগ ওঠে এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে সেখানে শতাধিক মানুষ নিহত হন। খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘গুণ্ডা’ বলে আখ্যা দেন এবং প্রতিবিপ্লবী ও বিদেশি শত্রুদের এই অশান্তিতে উসকানি দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেন।

অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং বাড়তে থাকা বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইব্রাহিম রাইসি জয়লাভ করেন। রাইসির মতো ঘনিষ্ঠ মিত্র প্রেসিডেন্ট হওয়ায় খামেনি ‘প্রতিরোধমূলক অর্থনীতি’র প্রচারণা চালাতে থাকেন, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং একইসঙ্গে বাণিজ্যের মোড় পূর্বের দেশগুলোর দিকে ঘুরিয়ে দেন। তবে এই পদ্ধতি কোনো দৃশ্যমান ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়।

বাধ্যতামূলক হিজাব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে পুলিশ হেফাজতে মাশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ২০২২ সালের দেশব্যাপী বিক্ষোভ খামেনির জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক বিধিনিষেধ এবং বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের জন্য আয়াতুল্লাহ খামেনি সমালোচিত হন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য বলছে, এই আন্দোলনে পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হন। আবারও খামেনি পুরো বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখেন। তিনি এই অশান্তি উসকে দেওয়ার জন্য পশ্চিমা এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের দায়ী করেন। তার যুক্তি ছিল যে, এই বিক্ষোভ আমিনির মৃত্যু বা হিজাব পরা নিয়ে নয়, বরং এটি বিদেশি হস্তক্ষেপের ফল।

২০২৫ সালের ১৩ জুন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইরানে হামলা চালায়। এতে ডজনখানেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার এবং শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হন এবং বেশ কয়েকটি পারমাণবিক কেন্দ্রসহ বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না বলে আলাদা মূল্যায়ন দিলেও, ইসরায়েল দাবি করে যে এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা।

ইরান এর জবাবে তেল আবিবে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ চলে। চূড়ান্ত পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা নিক্ষেপ করে। তখন একদিকে নেতানিয়াহু খামেনিকে হত্যার হুমকি দেন, অন্যদিকে ট্রাম্প তার ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেন।

খামেনি কড়া জবাব দিয়ে বলেন, ‘বুদ্ধিমান যারা ইরানকে চেনে এবং এর ইতিহাস জানে, তারা কখনোই এই জাতির সঙ্গে হুমকি দিয়ে কথা বলবে না। কারণ ইরানিরা আত্মসমর্পণ করবে না। আমেরিকানদের জানা উচিত, যেকোনো মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ নিঃসন্দেহে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে।’

খামেনির শাসন ইরানের অভ্যন্তরে নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর তা ভিন্ন মাত্রা পায়। ইরানিরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ইসরায়েলি আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু এই জাতীয়তাবাদী ঐক্যের প্রভাব খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ভয়াবহ নিষেধাজ্ঞা দেশের অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।

গত বছরের ডিসেম্বরের শেষের দিকে মুদ্রার মান পতনের ফলে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশব্যাপী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সেখানে খামেনির শাসনের অবসানের ডাক দেওয়া হয়। তখন গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস দমন-পীড়ন চালানোর খবর সামনে আসে।

এই গণজাগরণের পর দেশটি এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়ায়। আগের বিক্ষোভগুলোর সময় রাষ্ট্র ভর্তুকি দিয়ে বা সামাজিক বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও এবার বিক্ষোভের মূল কারণ অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের খুব বেশি রাস্তা ছিল না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেতে এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য ইরানকে কঠিন আপস করতে হতো—অন্যথায় আরও বড় গণজাগরণের মুখোমুখি হতে হতো। একপর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তেহরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন দফায় আলোচনা শুরু হয়।

‘অগ্রগতি’র কথা বলা হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জেনেভায় কয়েক দফা আলোচনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিতকরণ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধ করতে চায়।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ