মঙ্গলবার, ১১ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ,২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নান্দাইলে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম

শফিউল জুয়েল, নান্দাইল(ময়মনসিংহ): ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম পাওয়া গিয়েছে।

শুক্রবার (৩০ আগস্ট) দিনব্যাপী ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা ঘুরে এসব অনিয়মের ব্যাপারে জানা গেছে। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে এসব প্রকল্পের জন্য বরাদ্দের ১০ শতাংশ কাজও হয়নি।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ(টিআর) কর্মসূচির আওতায় ২য় পর্যায়ে খারুয়া ইউনিয়নের নরেন্দ্রপুর গ্রামের আব্দুল হাই মেম্বারের বাড়ির পশ্চিম পাশে রাস্তা মেরামত ও গর্ত ভরাটের জন্য ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার বাড়ির পশ্চিম পাশে কোনো রাস্তাই পাওয়া যায়নি। গ্রামবাসীর কাছে জিজ্ঞাসা করে অন্য কোনো আব্দুল হাই মেম্বার আছে কি না সেটাও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। তার বাড়িতে গিয়ে তাকে না পেয়ে ফোন করা হলে সেটা বন্ধ পাওয়া যায়।

সন্ধ্যায় আবার ফোন করা হলে তিনি জানান, কোনো প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ এসেছিলো সেটা জেনে আবার জানাবেন। কিছুক্ষণ পর তিনি ফোনে জানান, আরেকজন আব্দুল হাই মেম্বার আছে, তার বাড়ির পশ্চিমের রাস্তায় মাটি ভরাটের কাজ করা হয়েছে।

একই কর্মসূচির আওতায় কাদিরাবাদ মাদ্রাসা হতে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৭০ হাজার টাকা। সেখানেও নামমাত্র কাজ করে প্রকল্প শেষ করে দেওয়া হয়েছে। কমলা বিলের পশ্চিম পাশ হতে কাদির মেম্বারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের জন্য বরাদ্দ হওয়া ৭৭ হাজার ৪০০ টাকার কাজের এক দশমাংশও সম্পন্ন হয়নি বলে দেখা গেছে।

একই অর্থবছরের টিআর কর্মসূচির আওতায় ৩য় পর্যায়ে বনগ্রাম চৌরাস্তা থেকে হোসেন মেম্বারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতে বরাদ্দ ছিলো ৮৫ হাজার টাকা। সেই রাস্তাটি নিয়েও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। পরে জানা যায়, হোসেন নামে কোনো মেম্বার নেই। যিনি আছেন তিনি মেকার (টেকনিশিয়ান)।

এখানকার স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল কুদ্দুস মুন্সী জানান, আমি এই প্রকল্পে সই করেছি। অল্পকিছু কাজ হয়েছে। চেয়ারম্যান এভাবেই করিয়েছেন কাজ। তিনি সব বিষয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করেন না। ইচ্ছামতো পরিষদ চালান।

এছাড়াও এই কর্মসূচির বাকি প্রকল্পগুলোতেও ব্যাপক অনিয়ম দেখা গেছে। স্থানীয়রা জানেনই না এত টাকা বরাদ্দ থাকার পরেও অল্প কাজ করে কিভাবে প্রকল্প শেষ করে ফেলেছেন জনপ্রতিনিধিরা।

একই অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক সংসদ সদস্যের ৩য় কিস্তির প্রকল্পে খারুয়া ইউনিয়নের নাগপুর ঈদগাহ মাঠের মাটি ভরাট ও উন্নয়নের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এই প্রকল্প চেয়ারম্যানের বাড়ির কাছে হওয়া সত্ত্বেও অনিয়ম করতে ছাড়েননি। এমনকি এই প্রকল্প নিয়ে ঈদের দিন হট্টগোলও হয়েছিলো বলে খবর পাওয়া গেছে।

ঈদগাহের অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান দাবি করেন, সব কাজ ঠিক আছে। কোনো অনিয়ম হয়নি।

একই কর্মসূচির ৩য় প্রকল্পের আওতায় কয়ারপুর ওয়াজিবালি মুন্সি মসজিদ থেকে রামদী তসলিম মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার জন্য বরাদ্দ হয় ৮ টন চাল। কিন্তু সেখানে শুধুমাত্র খোলা মাঠের পাশের রাস্তায় মাটি ফেলা হয়েছে। বাড়ির সামনের রাস্তার দুয়েক জায়গায় মাটি ফেলা হলেও সেগুলো যথাযথভাবে না বসানোর কারণে বর্ষায় সৃষ্টি হয়েছে কর্দমাক্ত অবস্থা। এখন পায়ে হেঁটে চলারও উপায় নেই। রামদী মুন্সীবাড়ি থেকে হাবাতিয়াকান্দা পর্যন্ত রাস্তায় কোদাল দিয়ে ঘাস পরিস্কার করে ৯ টন চালের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

একই কর্মসূচিতে মহেষকুড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে ১০.১৪৭ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিভিন্ন নিচু জায়গায় অল্প বৃষ্টি হলেই পানি জমে থাকে বলে জানিয়েছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা। এমনকি মাটি না থাকায় সদ্যনির্মিত পাকা ঘরগুলোর গোড়ার দিকে গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ মাটিই ফেলা হয়েছে ইট দিয়ে তৈরি রাস্তার উপর। যার ফলে কাজের কাজ কিছু না হলেও ইটের তৈরি রাস্তা পরিণত হয়েছে কাঁচা রাস্তায়। একই অর্থবছরের টিআর কর্মসূচির আওতায় ২য় কিস্তিতে নাগপুর ইটখোলা হতে উছবের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তায় মেরামতের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু দেখা যায় ইটখোলার সাথেই খানাখন্দ রয়েছে রাস্তাটির।

স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এক্সাভেটর মেশিন দিয়ে মাটি কাটা হয়েছে। পুরো রাস্তায় মাটি ফেলা হয়নি। এছাড়া ২ লাখ টাকা বরাদ্দের টাওয়াইল বাজার থেকে কালিয়াপাড়া বাজার পর্যন্ত রাস্তার কাজেও দেখা গেছে ব্যাপক অনিয়ম।

এতো অনিয়মের ব্যাপারে কয়ারপুর গ্রামের স্থানীয় যুবকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এসব রাস্তা দিয়ে হেঁটেও চলাচল করা যায় না। এক কিলোমিটার দুরের পাকা রাস্তা পর্যন্ত কাঁদামাটি মাড়িয়ে যেতে হয়।

এ ব্যাপারে জানতে খারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল হাসনাত মিন্টুর বাড়িতে গেলে সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি। তার বাবা ও একজন যুবককে বাড়ির সামনে বসে থাকতে দেখা যায়।

চেয়ারম্যানের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আজ শুক্রবার তাই এলাকার বাইরে আছি। পরে কথা বলবো।

এসব অনিয়মের ব্যাপারে নান্দাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: আহসান উল্লাহ জানান, অফিসে আসুন এ ব্যাপারে কথা বলি৷

তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিল উত্তোলনের আগে প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস থেকে প্রকল্প পরিদর্শনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে৷ এমন অনিয়মের প্রকল্পের বিল কিভাবে পাশ হয়েছে সে ব্যাপারে প্রশ্ন রেখেছে উপজেলার সচেতন মহল। আবার প্রকল্পের স্থানে বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত সাইনবোর্ড থাকার কথা থাকলেও কোথাও এগুলো পাওয়া যায়নি।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

, বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *