
আব্দুর রহমান, সাতক্ষীরা: জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ বেশি, নতুন করে চিনিকল গড়ে না উঠা ও ভারতীয় চিনি আমদানির কারণে সাতক্ষীরাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আঁখের চাষ চরম আকারে হ্রাস পেয়েছে।
গেল ৩৫ বছরে শুধু সাতক্ষীরা জেলাতে আখের উৎপাদন কমেছে ৯৭ শতাংশ। আখের ভরা মৌসুমে এসব অঞ্চলে আখের দেখা নেই বললেই চলে।
২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে বিগত তিন’দশকে (প্রায় ৩০ বছর) সাতক্ষীরায় আখ চাষ প্রায় ৯৬% কমে গেছে, যা নির্দেশ করে আখ চাষের মোট আবাদযোগ্য জমি ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৬ সালে তা এসে দাঁড়ায় শতাংশে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও তীব্র গরমে আখের রসের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি,কম লাভ, শ্রমিক সংকট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সাতক্ষীরায় আখের চাষ কমছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দুই দশক আগেও এ জেলাতে আখ চাষ হতো ব্যাপকভাবে। তাদের হিসাব মতে, ১৯৯০ সালে সাতক্ষীরা জেলায় আখ চাষ হয়েছে ৫ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে। ২০০০ সালে আবাদ হয়েছে ৩ হাজার ৯৪৮ হেক্টর। এর পর ২০১০ সালে এ জেলায় আখের আবাদ হয়েছে মাত্র ১৪০ হেক্টর জমিতে। এরপর ২০২০ সালে জেলায় আখ চাষ হয়েছে মাত্র ১৩৫ হেক্টর জমিতে। আর ২০২৬ সালে তা এসে দাঁড়ায় ১১৮ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সদরে ৬ হেক্টর, কলারোয়ায় ১২ হেক্টর, তালায় ৫৭ হেক্টর, দেবহাটায় ০৪ হেক্টর, কালিগঞ্জে ২৮ হেক্টর, আশাশুনিতে ০৫ হেক্টর এবং শ্যামনগরে ০৬ হেক্টর। আশ্বিন-কার্তিক মাসে মন্দার সময়ে যারা আখ কেটে রস বিক্রয় করে সংসার চালায় তারাই বর্তমানে আখ চাষ করছে বলে জানা যায়।
সূত্র মতে, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের অধীনে বর্তমানে দেশে ১৫টি চিনিকল আছে। এগুলোর বার্ষিক মোট উৎপাদন ক্ষমতা দুই লাখ ১০ হাজার টন। আগে এক লাখ টনের বেশি উৎপাদন করতে পারলেও এখন ৬০-৭০ হাজার টনের বেশি উৎপাদন করতে পারে না। প্রতিবছরই তাদের চিনি উৎপাদন কমছে, বিপরীতে বাড়ছে লোকসান। ট্যারিফ কমিশন বলছে, দেশে যে পরিমাণ আখ উৎপাদিত হয়, তার অর্ধেকও চিনিকলগুলো পেলে তাদের উৎপাদন ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারত। দেশে বছরে ২৩ লাখ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়; যার শুধু আমদানি মূল্যই সাত হাজার কোটি টাকা। এসব চিনি কারখানায় পরিশোধন হয়ে যখন বাজারে বিক্রি হয় তখন বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। দেশের শীর্ষ পাঁচটি শিল্পগ্রুপ চিনির এই বিশাল বাজারের বেশির ভাগই নিয়ন্ত্রণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসডিএ পূর্বাভাস বলছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে চিনি আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৩০ হাজার টন; ২০১৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ২৪ লাখ ২৯ হাজার টন। তবে চলতি বছর ২০২৬ সালে দেশে চিনি আমদানি বেড়ে ২৫ লাখ ৩০ হাজার টনে উন্নীত হতে পারে।
তালা উপজেলার খলিষখালি মঙ্গলানন্দকাটি গ্রামের সৈয়েদ শেখ জানান, তার গ্রামের ৭০-৮০ শতাংশ কৃষক দীর্ঘকাল ধরে আখ চাষ করছেন। তিনিও ৩০-৩৫ বছর আখ উৎপাদন করেছেন। কিন্তু গত ১০-১২ বছর ধরে তিনি আখ চাষ আর করছেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ২০০০ সালের বন্যা, ২০০৭ সালে সিডর ও ২০০৯ আইলা, ২০২০ সালে আম্পান ও ২০২১ সালে ঘূণিঝড় ইয়াসের পর থেকে আগের মতো আখের ফলন হয় না। ফসলি জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আখ ক্ষেতে বিভিন্ন রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। এসব রোগের কোনো প্রতিকার না পেয়ে ফসলটি চাষ করা বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো: সাইফুল ইসলাম জানান, জলবায়ু পরিবর্তন, চিনিকল না থাকা এবং ফসলটি এক বছর মেয়াদি হওয়ায় চাষিরা আগ্রহ হারাচ্ছেন আখ চাষে। যেখানে একই জমিতে বছরে তিনটি ফসল করতে পারে সেখানে এক বছর মেয়াদি আখ চাষ করতে চাচ্ছেন না কৃষকরা।
তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা রোগের প্রতিকারের জন্য কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।











