বুধবার, ২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ,৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

স্বর্ণ ও রুপার দরে নাটকীয় উত্থান-পতন: নৈপথ্যে ট্রাম্পের পাগলামি

যায়যায়কাল ডেস্ক: গত এক বছরে টানা বাড়তে বাড়তে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পর গত শুক্রবার ও সোমবার হঠাৎ করেই এই দুই মূল্যবান ধাতুর দাম বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ে।

গত এক বছরে স্বর্ণ ও রুপার দাম এতটা কেন বেড়েছিল?

স্বর্ণ ও রুপাকে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা মূল্য ধরে রাখার নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে দেখেন।

ইতিহাস বলছে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সময় এসব ধাতুর চাহিদা বেড়ে যায়।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন গত এক বছরে বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। তার সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যকে বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই অনিশ্চিত ও অপ্রত্যাশিত বলে মনে করেন।

শুল্কনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে চাপ, এমনকি ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি—এসব কারণে ট্রাম্প বারবার প্রচলিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ম ভেঙেছেন, যা বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের মান দুর্বল হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা এমন সম্পদের দিকে ঝুঁকেছেন, যেগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে মূল্য ধরে রাখতে পারে। স্বর্ণ ও রুপা সেই তালিকার শীর্ষে ছিল।

গত বছর ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত সময়ে স্বর্ণের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়। একই সময়ে রুপার দাম প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই ঊর্ধ্বগতি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতিকে প্রকাশ করে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। যদিও জাপান ও ইতালির মতো কিছু দেশের ক্ষেত্রে জিডিপির তুলনায় ঋণের হার আরও বেশি।

প্লেনিসফার ইনভেস্টমেন্টসের পোর্টফোলিও কৌশল বিভাগের প্রধান দিয়েগো ফ্রানজিন আল জাজিরাকে বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে প্রায় সব আর্থিক লেনদেনেই কোনো না কোনো ঋণঝুঁকি থাকে—হোক তা রাষ্ট্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু এ ব্যাপারে স্বর্ণের কোনো পাল্টা পক্ষ নেই।’

তিনি বলেন, ‘স্বর্ণ কোনো প্রতিশ্রুতি বা সুদ দেয় না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করে না। অস্তিত্বের কারণেই এটি নিরাপত্তা দেয়।’

তার মতে, রেকর্ড পরিমাণ সরকারি ও বেসরকারি ঋণের এই সময়ে স্বর্ণের এ বৈশিষ্ট্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চাহিদা বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণে স্বর্ণ কিনছে।

চীন, তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম প্রতি ভরিতে প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার টাকায় পৌঁছে রেকর্ড গড়ে।

একই দিনে রুপার দাম ওঠে প্রায় ৬ হাজার ২০০ টাকা।

হঠাৎ পতন কেন?

শুক্রবার হঠাৎ করেই এই ঊর্ধ্বগতি থেমে যায়। স্বর্ণের দাম প্রায় ১০ শতাংশ এবং রুপার দাম প্রায় ২৮ শতাংশ কমে যায়।

সোমবার পতনের হার আরও বাড়ে। দিন শেষে স্বর্ণের দাম প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং রুপার দাম প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নেমে যায়।

মঙ্গলবার বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৬টা পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় ৩.৫ শতাংশ এবং রুপার দাম প্রায় ৪.৫ শতাংশ বেড়েছে।

এই পতনের কারণ নিয়ে বিশ্লেষকরা এখনো স্পষ্ট একমত না।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, যেভাবে ট্রাম্প দাম বাড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিলেন, তেমনি দাম কমার পেছনেও তার ভূমিকা আছে।

শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তিনি কেভিন ওয়ার্শকে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দেবেন। বিনিয়োগকারীরা এই সিদ্ধান্তকে তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল ও প্রচলিত ধারা অনুসরণকারী বলে দেখেছেন।

ওয়ার্শ আগে ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর বোর্ডের সদস্য ছিলেন।

বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা ছিল, ট্রাম্প এমন কাউকে বেছে নিতে পারেন, যিনি মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি উপেক্ষা করে সুদের হার দ্রুত কমাবেন। ট্রাম্প বিদায়ী ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের ওপর দীর্ঘদিন ধরেই সুদ কমানোর চাপ দিয়ে আসছিলেন।

একই দিন ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা করছেন। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানকে নিয়ে সামরিক হুমকি দিয়েছিলেন তিনি।

এই ঘোষণাগুলোর ফলে বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা দেখেন এবং ডলার শক্তিশালী হতে পারে—এমন ধারণা তৈরি হয়।

ফলে অনেকেই স্বর্ণ ও রুপা বিক্রি করে দেন।

তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই ব্যাখ্যা পুরো ঘটনার জন্য প্রযোজ্য নয়।

তাদের মতে, দাম এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে সংশোধন বা পতন ছিল অনিবার্য।

ব্যাংক জুলিয়াস বেয়ারের এশিয়া অঞ্চলের গবেষণা প্রধান মার্ক ম্যাথিউজ বলেন, ‘সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, আগের সপ্তাহেই দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল। বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলতে শুরু করলে পতনটা তুষারগোলার মতো গড়িয়ে পড়ে।’

সামনে কী হতে পারে?

বাজারের ভবিষ্যৎ অনুমান করা সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ।

তবে কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণ ও রুপার দাম আবারও বাড়তে পারে।

রোববার প্রকাশিত এক নোটে জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষকেরা বলেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ স্বর্ণের দাম প্রতি ভরিতে ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি বর্তমান দামের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।

নোটে তারা বলেন, ‘স্বর্ণ এখনো একটি শক্তিশালী ও বহুমুখী বিনিয়োগ সুরক্ষা মাধ্যম। বিনিয়োগকারীদের চাহিদা আমাদের আগের ধারণার চেয়েও বেশি।’

জুলিয়াস বেয়ারের বিশ্লেষক ম্যাথিউজ বলেন, বাজার স্থিতিশীল হয়েছে বলে বিনিয়োগকারীরা মনে করলে আবারও স্বর্ণ ও রুপার চাহিদা বাড়তে পারে।

তার মতে, দুটি বিষয় এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের ডলার আরও দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর প্রবণতা।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ