মঙ্গলবার, ২২শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

রুপালী পর্দা জয় করে এবার রাজপথ জয়

যায়যায়কাল ডেস্ক: তামিল চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক থালাপতি বিজয়কে এত দিন পর্দায় দেখা গেছে নানা বীরোচিত ভূমিকায়। নায়ক চরিত্রে ক্ষমতাবানদের দম্ভ তিনি চূর্ণ করেছেন শৌর্যের স্বাক্ষর রেখে। এবার তিনি রাজনীতির ময়দানেও জয় করলেন মানুষের হৃদয়।

মাত্র দুই বছর আগে রাজনৈতিক দল গঠন করে তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চমক দেখিয়েছেন তিনি। থালাপতি বিজয়ের আসল নাম জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর। ২০২৪ সালে তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) নামে দল গঠন করেছিলেন তিনি। তামিলনাড়ুর মানুষের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনায়ও সোচ্চার হন তিনি। বিপুল জনসমাবেশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মোদি সরকারের দমননীতির সমালোচনা করে তার দেওয়া বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে অনলাইন জগতে।

রাজনীতির মাঠে সংগ্রামী চরিত্রের আভাস দেওয়া বিজয় এখন ভোটেও বিজয়ী হচ্ছেন। ২৩৪ আসনের বিধানসভায় ১০৭টিতে জয় পেয়েছে তার দল টিভিকে। এখানে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮ আসন। একক দল হিসেবে টিভিকে এই সংখ্যায় পৌঁছাতে না পারলেও সবচেয়ে বেশি আসন তাদেরই হয়েছে।

একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টিভিকে সরকার গঠন করতে না পারলেও অন্য এক বা একাধিক দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ বিজয়ের সামনে থাকছে। শেষ পর্যন্ত সেটা হলে ৪৯ বছরের মধ্যে তামিলনাড়ুতে প্রথম চলচ্চিত্র তারকা থেকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসবেন তিনি। এর আগে ১৯৭৭ সালে চলচ্চিত্রজগৎ থেকে এসে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন এম জে রামচন্দ্রন। ১৯৮৭ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত টানা ১০ বছর তামিলনাড়ু শাসন করেন তিনি।

এম জে রামচন্দ্রন অভিনেতা হিসেবে যে ভক্তকুল পেয়েছিলেন, তাদের ভালোবাসাকে রাজনীতিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন। পরে জনকল্যাণমূলক কাজ করে ভোটারদের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন তিনি।

এর পর থেকে কোনো অভিনেতাই লাখ লাখ ভক্ত নিয়েও নির্বাচনের সেই শেষ বৈতরণি পার হতে পারেননি। এমনকি জয়ললিতার মতো বড় তারকাও নিজে কোনো নতুন দল গড়ে মুখ্যমন্ত্রী হননি। বরং তিনি এমজিআরের গড়া দল সর্বভারতীয় আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগামের (এআইএডিএমকে) উত্তরাধিকারী হয়ে দলটিকে আরও সুসংহত করে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের একক নিয়ন্ত্রণে এনে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।

এবার সেই অচলায়তন ভাঙছেন থালাপতি বিজয়। তাঁর এই উত্থান অবাক করার মতো। কারণ, খুব অল্প সময়ে ও সুপরিকল্পিতভাবে তিনি এই জায়গায় পৌঁছেছেন। আগের অভিনেতাদের মতো তিনি অভিনয়জগৎকে আঁকড়ে ধরে রাজনীতির ময়দানে নামেননি।

শুরুটা হয়েছিল ২০০৯ সালে

বিজয় তার ভক্তদের একজোট করার কাজ শুরু করেছিলেন ২০০৯ সাল থেকেই। তখন তার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফ্যান ক্লাবগুলোকে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ নামে একটি সংগঠনের পতাকাতলে নিয়ে আসেন। শুরুতে এটি শুধু সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক সংগঠন হিসেবে কাজ করত। তারা মানুষের বিপদে সাহায্য করা, শিক্ষাসামগ্রী বিলি করা এবং স্থানীয় নানা সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসার মধ্য দিয়ে একদম তৃণমূল পর্যায়ে পরিচিতি তৈরি করে ফেলে।

২০১১ সালে এই সংগঠন এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দেয়। এর মধ্য দিয়ে বিজয় প্রথমবারের মতো সরাসরি কোনো রাজনৈতিক পক্ষে যোগ দেন। তিনি মূলত দেখতে চেয়েছিলেন, তার তারকা খ্যাতি দিয়ে ভোট টানা যায় কি না।

২০১০-এর দশকের শেষ এবং ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে সিনেমার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিজয়ের উপস্থিতি ও কথাবার্তায় রাজনৈতিক বার্তা থাকতে শুরু করে। ২০১৯ সালে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ (সিএএ) নিয়ে তার সমালোচনা এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তিনি চলচ্চিত্রের গণ্ডির বাইরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চান।

বিজয়ের সিনেমার গান প্রকাশের অনুষ্ঠান (অডিও লঞ্চ), ভক্তদের সঙ্গে সভা এবং নানা সমাজসেবামূলক অনুষ্ঠানে পরীক্ষার চাপ, তরুণদের বেকারত্ব, দুর্নীতি ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলো বেশি বেশি করে আলোচনা হতে থাকে। এ কথাগুলো নতুন ভোটার ও শহরের স্বপ্নবান তরুণদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।

মনের ভেতর দাগ কেটেছিল

রাজনৈতিক দল ঘোষণার আগেই তার সংগঠনের শক্তি প্রমাণিত হয়। ২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তার সংগঠনের প্রার্থীরা যেসব আসনে লড়েছিলেন, সেগুলোর বেশির ভাগেই জয়লাভ করেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে তার জনপ্রিয়তা শুধু লোক জড়ো করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি ভোট টানতেও সক্ষম।

অবশেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজয় তার রাজনৈতিক দল টিভিকের আত্মপ্রকাশ ঘোষণা করেন। তিনি খুব পরিষ্কারভাবেই সবকিছু জানান।

বিজয় বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তার দল একাই লড়বে। ভোটের আগে তারা কারও সঙ্গে জোট বাঁধবে না। রাজ্যের বড় দুই দল ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বাইরে তারা একটি পরিচ্ছন্ন বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে চায়।

দল ঘোষণার পরপরই বিজয় সিনেমার জগৎ থেকে বিদায় নেওয়ার কথা জানান। এর মধ্য দিয়ে তার তিন দশকের অভিনয়জীবনের অবসান ঘটে। এই সময়ে তিনি প্রায় ৭০টি চলচ্চিত্রে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অভিনয় থেকে সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তার বার্তাটি ছিল নির্ভুল—এটি (রাজনীতি) কোনো শখের বিষয় নয়।

টিভিকে পরবর্তী দুই বছরে একটি সাধারণ ফ্যান ক্লাব থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। তারা জেলা কমিটি, নির্বাচনী এলাকার ইউনিট ও ভোটকেন্দ্রভিত্তিক দল গঠন করে। সেই সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির বিষয়গুলোকে তারা তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে। বিজয়কে গতানুগতিক বক্তা হিসেবে নয়, বরং মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা একজন নেতা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং খুব সুন্দরভাবে আয়োজন করা জনসভাগুলো এতে বড় ভূমিকা রাখে।

থালাপতি বিজয়ইনস্টাগ্রাম থেকে

তবে এই পথচলা একেবারে মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে কারও এলাকায় টিভিকের একটি অনুষ্ঠানে ভিড়ের মধ্যে পদদলিত হয়ে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে এটি ছিল বিজয়ের জন্য প্রথম বড় সংকট। এ ঘটনা দলের শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এ ঘটনার পর তার প্রতিক্রিয়া ছিল পরিমিত, প্রকাশ্য ও ভুল শুধরে নেওয়ার মানসিকতার প্রকাশ। তখন এটা দেখে আগেভাগেই বোঝা গিয়েছিল, ভবিষ্যতে সরকার চালানোর ক্ষেত্রে চুলচেরা বিশ্লেষণের মুখোমুখি হলে তা তিনি কীভাবে সামলাবেন। এখন পরিসংখ্যান বলছে, তার এই ঝুঁকি নেওয়াটা কাজে লেগেছে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ