
যায়যায়কাল ডেস্ক: তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে মূলত দুটি দলের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল—ডিএমকে ও এআইএডিএমকে। কিন্তু এবার এ রাজ্যে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই ইতিহাস গড়েছেন রুপালি পর্দার জনপ্রিয় নায়ক সি জোসেফ বিজয়ের (থালাপতি বিজয়) নতুন দল তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে)।
তামিলনাড়ু বিধানসভায় ২৩৪ আসনের মধ্যে টিভিকে ১০৮টিতে জয়লাভ করে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটিকে একটি ‘অভাবনীয় জয়ও’ বলা হচ্ছে।
তবে এই বিরাট সাফল্যই এখন বিজয়ের জন্য এক সংকটে পরিণত হয়েছে। সরকার গড়ার হাতছানি থাকলেও মাত্র ১০টি আসনের ব্যবধানে আটকে আছে টিভিকে। তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের ম্যাজিক ফিগার ১১৮।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকর ইতোমধ্যেই বিজয়কে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন তিনি এখনো প্রমাণ করতে পারেননি।
তাই রাজভবনে গিয়ে সরকার গঠনের দাবি জানানোর পথটি এই মুহূর্তে বিজয়ের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক যুদ্ধ।
১০-এর বাধা
এই ১০টি আসনের ঘাটতির ফলে দর কষাকষি ও ভাঙন ধরানোর ভয় বিজয়ের সামনে পাহাড়সম বাধা তৈরি করেছে। প্রথমত, টিভিকের জেতা আসনগুলোর মধ্যে অন্তত ১৩টি আসনে জয়ের ব্যবধান এক হাজারের কম ছিল। অর্থাৎ বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ওই আসনগুলোতে তারা জিতেছে তা বলা মুশকিল।
দ্বিতীয়ত, সরকার গঠন করতে হলে বিজয়কে এখন ছোট দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে। বিরোধী শিবিরগুলো এই সুযোগে ‘দিল্লি ও চেন্নাই স্টাইলের রাজনৈতিক দর কষাকষি’ শুরু করে দিতে পারে বলে ধারণা করছে এনডিটিভি।
যেহেতু টিভিকে একটি নতুন দল এবং তাদের বিধায়কদের বেশিরভাগই জীবনে প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন, তাই তাদের ওপর প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপ, ভয় ও প্রলোভন রয়েছে।
রাজনৈতিক ভাষায় একে বলা হয় ‘রিসর্ট পলিটিক্স’ বা বিধায়ক কেনাবেচার রাজনীতি। আর এই শঙ্কার কালো ছায়া এখন বিজয়ের দলের ওপর ঘুরপাক খাচ্ছে।
বাড়তি সময় চায় টিভিকে
বিজয় এককভাবে এ সাফল্য পাননি। তার পেছনে রয়েছে অত্যন্ত বিশ্বস্ত একটি ‘ইনার সার্কেল’ বা উপদেষ্টা দল। এই দলে আছেন বুসি আনন্দ, যিনি তামিলনাড়ুর তৃণমূল পর্যায়ে দলের সব কাজ তদারকি করেন। দলের নির্বাচনী কৌশলের মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন আদাভ অর্জুনা এবং দলের আর্থিক ও লজিস্টিক দিকগুলো সামলেছেন বিষ্ণু রেড্ডি।
ইতোমধ্যে নবনির্বাচিত বিধায়করা একটি রেজল্যুশন সই করে বিজয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দলের নেতা নির্বাচিত করেছেন বলে জানায় দ্য হিন্দু। টিভিকের এই কোর কমিটি এখন রাজ্যপালের কাছে গিয়ে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য দুই সপ্তাহ সময় চাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
তবে তা পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা কম বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
পর্দার বিজয়কে ভক্তরা সবসময় একাই সব বাধা জয় করতে দেখেছেন এবং জনগণও বিপুল ভোটে জিতিয়ে তাকে নতুন ‘জননেতা’ হিসেবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবের রাজনীতি তো সিনেমার চিত্রনাট্য মেনে চলে না। বিজয়ের যে একক ও স্বাধীন ক্ষমতার ইমেজ ছিল, তা এখন জোট রাজনীতির জটিল সমীকরণে আটকা পড়েছে।
জোট গড়ার জন্য টিভিকে-কে ছোট দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলাতে হবে, কিন্তু এই দলগুলোর নিজেদের মধ্যেই চরম মতবিরোধ রয়েছে।
যেমন, তূলনামূলক ছোট দল ভিসিকে ও পিএমকে ঐতিহাসিকভাবে একে অপরের কট্টর বিরোধী।
এর মানে হলো, বিজয় চাইলেই কেবল ‘ম্যাজিক নম্বর’ মেলানোর জন্য সবাইকে একসঙ্গে নিজের জোটে টানতে পারবেন না। তাকে এমন দলগুলোর মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে যারা একে অপরের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
এই মুহূর্তে তাই জোট রাজনীতির এই নির্মম চাপই বিজয়ের স্বাধীন ইমেজের পথে বড় বাধা।
বিজয়ের সামনে কয়েকটি সম্ভাব্য কিন্তু অত্যন্ত জটিল রাস্তা খোলা রয়েছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিভিকের জন্য বিকল্প হতে পারে ভিসিকে, সিপিআই ও সিপিএমের মতো ছোট দলগুলোর সমর্থন।
কিন্তু এর জন্য ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হবে। কংগ্রেস বিজয়কে সমর্থন দিলে ডিএমকের জন্য তা চরম ক্ষোভের কারণ হবে। কারণ জাতীয় স্তরে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ভারতের বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার অংশ ডিএমকে। তাই জোটের মধ্যে ফাটলও ধরতে পারে।
এপিবি আনন্দের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কংগ্রেসের সঙ্গে বিজয়ের মিলে যাওয়ার সম্ভাবনাকে জোট সম্প্রসারণ হিসেবে দেখছে না ডিএমকে। বরং, তাদের রাজনৈতিক সীমানায় সরাসরি ‘অনুপ্রবেশ’ হিসেবে বিবেচনা করছে দলটি।
অন্যদিকে, পিএমকের সমর্থন নিলে তা পেছন থেকে বিজেপির কারসাজির সুযোগ তৈরি করতে পারে। জাতীয় রাজনীতিতে এই দলটি বিজেপির জোট এনডিএর অংশ।
প্রতিবেদনে দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে এআইএডিএমকের সমর্থনের ইঙ্গিত আছে। এর মাধ্যমে বিজয় অনায়াসেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারেন। কিন্তু এআইএডিএমকে সমর্থন দিতে চাইলে তাদের বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ছাড়তে হবে।
বিজয়ের দল যেহেতু বিজেপির কট্টর বিরোধী, তাই এটি বিজয়ের নিজের আদর্শগত অবস্থানেরও সম্পূর্ণ বিরোধী হবে।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো আনুষ্ঠানিক জোট ছাড়া একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন করা তৃতীয় বিকল্প হতে পারে। কিন্তু এটি রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা, যা ‘স্থায়ী অনিশ্চয়তা’ তৈরি করবে।
বিধানসভার প্রতিটি বিল পাস করা বা প্রতিটি অধিবেশন তখন সরকারের টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হবে। কারণ অন্তত অর্ধেক বিধায়ক রাজি না হলে কোনো বিল পাস করা সম্ভব না।
রুপালি পর্দার নায়ক থেকে বাস্তবের কঠিন পরীক্ষা বিজয়ের এই অভাবনীয় জয়ে তার হাজারো ভক্ত উন্মাদনায় ভাসছেন। কেউ কেউ তার মুখের ছবি বুকে ট্যাটু করে উল্লাস করছেন।
কিন্তু জনগণের এই আবেগের উল্টোদিকে যে গাণিতিক ও বাস্তবতার কঠিন হিসাব, তা বিজয়ের কাছে একদমই নতুন। তিনি আগে কখনো সরকারি বা প্রশাসনিক পদে ছিলেন না। আর তামিলনাড়ুর মতো ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির একটি রাজ্য চালানো এমন সহজ কাজ নয়, যা করতে করতে শেখা যাবে।
শুধু তাই নয়, তার নতুন সরকার এমন একটি রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে যার ঘাড়ে বিপুল ঋণের বোঝা।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, গত দশ বছরে তামিলনাড়ুর ঋণ ২ দশমিক ৮ লাখ কোটি রুপি থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৬ লাখ কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে।
টিভিকে তাদের ইশতেহারে তামিলনাড়ুর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাই এটি পূরণ করতে হলে বিজয়কে প্রচলিত ধারার বাইরের কোনো সমাধান খুঁজতে হবে।
তবে, ১০ আসনের ঘাটতি বিজয়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সামান্য দেরি হলেই বিরোধী শিবিরগুলো রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে, তাই তাকে অত্যন্ত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রুপালি পর্দার নায়ক থেকে বাস্তবের জননেতা হওয়ার পথে এই রাজনৈতিক অচলাবস্থাই প্রমাণ করবে তিনি আসলে কতটা পোড়খাওয়া রাজনীতিক হয়ে উঠতে পেরেছেন।











