বুধবার, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

জুলাই আন্দোলনকে কলঙ্কিত করেছে ইউনুস নেতৃত্বাধীন ‘কিচেন কেবিনেট’

যায়যায়কাল প্রতিবেদক: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারে ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল বলে উল্লেখ করেছেন ওই সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তবে তিনি এই ‘কিচেন কেবিনেটের’ সদস্য ছিলেন না বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির এই নেতা।

মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ এ কথা বলেন।

সম্প্রতি ঝিনাইদহে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হামলা এবং সমসাময়িক বিষয়ে দলের বক্তব্য তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে একজন সাংবাদিক আসিফ মাহমুদের কাছে জানতে চান, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের ‘কিচেন কেবিনেটের’ সদস্য ছিলেন কি না। এর জবাবে তিনি বলেন, ‘কিচেন কেবিনেট ছিল। কিন্তু আমি সেটার সদস্য ছিলাম না।’

রাষ্ট্র বা সরকার পরিচালনায় কিচেন কেবিনেট বলতে আনুষ্ঠানিক কোনো ফোরাম নেই। এই শব্দবন্ধ দিয়ে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের কিছু বিশ্বস্ত সহকর্মীকে নিয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠীকে বোঝায়, যাদের সঙ্গে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন ও সিদ্ধান্ত নেন।

সম্প্রতি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের এক সাক্ষাৎকারের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে সাবেক এ উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনায় সাত সদস্যের একটি কিচেন কেবিনেট সক্রিয় ছিল। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সেখান থেকেই আসত। তারা প্রতি মঙ্গলবার যমুনায় (সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন) বৈঠকে বসতেন। এদের হস্তক্ষেপ ও মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রভাব বিস্তারের কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কিন্তু সরকারের অস্বস্তির কথা ভেবে তা আর সম্ভব হয়নি।

২০২৪ সালের জুলাই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।

অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র-তরুণদের প্রতিনিধি হিসেবে ওই সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তিনি প্রথমে ক্রীড়া উপদেষ্টা হলেও পরে গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সঙ্গে তিনিও অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বিদায় নেন। এরপর এনসিপির মুখপাত্রের দায়িত্বে আসেন তিনি।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করা বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে কেউ এনসিপির মতামত নেয়নি বলে উল্লেখ করেছেন আসিফ মাহমুদ।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই চুক্তিটা বিএনপিই করেছে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে তাদেরই বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে (খলিলুর রহমান) দিয়ে তারা এটা অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। এখন একটা পলিটিক্যাল ব্লেম গেম (রাজনৈতিক দোষারোপের খেলা) চলছে।’

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয় পায় বিএনপি। এর তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সই করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। সেই চুক্তির নেপথ্যে সে সময়ের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (বর্তমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) খলিলুর রহমানের ভূমিকার বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়।

এ বিষয়ে খলিলুর রহমান গত ৪ মার্চ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি আমাদের প্রধান দুটি দলের প্রধানের (বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী) সঙ্গে নির্বাচনের আগেই কথা বলেছেন। তারাও এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। সুতরাং এমন নয় যে এটা আমরা অন্ধকারে করেছি।’

খলিলুর রহমানের ওই বক্তব্যের পর গত ৬ মার্চ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সরকার কয়েকটি চুক্তি করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ ধরনের কোনো চুক্তি নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি।’

এরপর ১৫ মে রংপুরে এক অনুষ্ঠানে শফিকুর রহমান আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কেউ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনা করেনি।

এবার চুক্তিটির বিষয়ে মুখ খুললেন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের শরিক দল এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘যখন (৯ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি হয়, তখন আমি এনসিপির মুখপাত্র ছিলাম। ফলে চুক্তি সম্পর্কে আমার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কিছু জানা সম্ভব নয়।’

সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, ‘অনেকেই বলেন, বাণিজ্যচুক্তি সম্পর্কে সব দলকেই জানানো হয়েছে। আমি আমার দলের আহ্বায়কসহ সবার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি, চুক্তির বিষয়ে কেউ এনসিপির কনসার্ন নেয়নি। এটা আমি পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছি।’

সরকারের উদ্দেশে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, ‘চুক্তিটি করেছেন বর্তমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যদি অন্য কিছু হয়, তাহলে আপনারা এ চুক্তিটা পর্যালোচনা করুন, বাতিল করুন। চুক্তির যে যে অংশগুলো বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আলোচনা চালান।’

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আপনারা বারবার অন্তর্বর্তী সরকার, এনসিপি, জামায়াত—এদের ওপর দায় দিতে চান। কিন্তু চুক্তি করেছে আপনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ ব্লেম গেমের রাজনীতি, মানুষকে ভুলের মধ্যে রাখার চেষ্টা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’

সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাক্ষাৎকারে যা বলেছিলেন

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের ‘কিচেন কেবিনেট’ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতো বলে দাবি করেছেন সেই সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি জানান, প্রতি মঙ্গলবার এই ‘কিচেন কেবিনেট’ এর বৈঠক হতো। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিক উপদেষ্টার প্রভাব ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ পরিস্থিতির কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তবে তা গ্রহণ করা হয়নি।

সোমবার (২৫ মে) বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।

এর আগে উপদেষ্টা পরিষদের বাইরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের আরেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। গত ফেব্রুয়ারিতে একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সরকারের বেশির ভাগ বড় সিদ্ধান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বাইরেই হতো।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি প্রসঙ্গে তৌহিদ হোসেন বলেন, এই চুক্তি বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি এবং এতে মন্ত্রণালয়ের কোনো সম্পৃক্ততাও ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির নেপথ্যে নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি বলেন, কোনো বিশেষ বাধ্যবাধকতার কারণে এই চুক্তি করতে হতে পারে, তবে বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।

তৌহিদ হোসেন বলেন, “ডিপ স্টেট” পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনার সঙ্গেই সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকে। তার দাবি অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রেই এই শক্তিগুলো ঘটনা নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করে। নিজের প্রত্যাশার বড় অংশ পূরণ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, একবার তাকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কিচেন কেবিনেটের বৈঠকে যেতে হয়েছিল। পরে জানতে পারেন, প্রতি মঙ্গলবার সেখানে এমন বৈঠক হতো এবং সেখান থেকেই কিছু সিদ্ধান্ত আসতো। তবে এ বিষয়ে তার পূর্ণ তথ্য ছিল না বলেও জানান তিনি।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি দিয়েছিল সরকার। এর কোনো উত্তর দেয়নি ভারত। এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, উত্তর কি আমরা চেয়েছিলাম? কোনো উত্তর খুব একটা আমরা আশা করিনি। আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে চলে গেছে বা যাচ্ছে, এমনটা না। মানুষের স্মৃতিশক্তি খুব দীর্ঘ নয়। আমি বিশ্বাস করি, আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসবে এবং আমার অনুমান তারা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে।

বিএনপি সরকারকে নিয়ে এখনই কোনো মূল্যায়ন করতে নারাজ তিনি। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনকে সামলানো সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সাবেক এই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আমি কোনো পক্ষেরই লোক হিসেবে বিবেচিত হবো না এবং কেউই আমার শক্র হবে না। এটা হলো বড় চ্যালেঞ্জ; আগেও ছিল, এখনো তাই।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ