বৃহস্পতিবার, ৬ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,২২শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গবেষণা: প্লাস্টিকের স্ট্র’র চেয়ে ৬.৩৩ গুণ বেশি ক্ষতিকর কাগজের তৈরি স্ট্র

যায়যায়কাল ডেস্ক: কাগজের স্ট্রের তুলনায় প্রচলিত প্লাস্টিকের স্ট্র তৈরির প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত সামগ্রিক জীবনচক্রে ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত প্রভাবের সূচক ৬ দশমিক ৩৩ গুণ কম।

দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত কিছু স্ট্রের পরিবেশগত প্রভাব প্রচলিত প্লাস্টিকের স্ট্রের চেয়েও বেশি।

বুধবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে চার ধরনের স্ট্র—প্রচলিত প্লাস্টিক, কাগজ, জীবাণুবিয়োজ্য প্লাস্টিক এবং উদ্ভিদভিত্তিক কাঁচামাল থেকে তৈরি বায়ো-পলিইথিলিন (বায়ো-পিই)—এর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার জলবায়ু, জ্বালানি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন দেশটির পিপল পাওয়ার পার্টির আইনপ্রণেতা কিম উই-সাং।

গবেষকেরা কাঁচামাল উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য ব্যবহারের পর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত ১৬টি পরিবেশগত সূচকে এসব স্ট্র’র প্রভাব পরিমাপ করেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট মানবস্বাস্থ্যগত প্রভাবের সূচকে বায়ো-পিই স্ট্র’র স্কোর প্রচলিত প্লাস্টিকের স্ট্র’র তুলনায় ১৬ দশমিক ১৮ গুণ বেশি। জীবাণুবিয়োজ্য প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে এ সূচক ৩ দশমিক ৩৪ গুণ এবং কাগজের স্ট্র’র ক্ষেত্রে ৬ দশমিক ৩৩ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

তবে গবেষণায় ব্যবহৃত ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট সূচকটি কোনো স্ট্র ব্যবহার করলেই মানুষের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি সরাসরি কতটা বাড়ে, তার পরিমাপ নয়। বরং উৎপাদন, ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপ বিবেচনায় নিয়ে তৈরি একটি মডেলভিত্তিক জীবনচক্র মূল্যায়ন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অম্লীকরণ বা পরিবেশের অম্লত্ব বৃদ্ধির প্রভাবের ক্ষেত্রেও বিকল্প স্ট্রগুলোর স্কোর বেশি। প্রচলিত প্লাস্টিকের তুলনায় কাগজের স্ট্র’র এ প্রভাব ২ দশমিক ০৪ গুণ, জীবাণুবিয়োজ্য প্লাস্টিকের ১ দশমিক ৯৮ গুণ এবং বায়ো-পিই স্ট্র’র ৫ দশমিক ৯ গুণ বেশি।

প্রচলিত প্লাস্টিকের স্ট্র ১৬টি পরিবেশগত সূচকের মধ্যে ১০টিতে তুলনামূলকভাবে কম প্রভাব ফেলেছে। এসব সূচকের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, অম্লীকরণ, বায়ুবাহিত সূক্ষ্ম কণার দূষণ এবং মানবস্বাস্থ্যের ওপর বিষাক্ততার প্রভাব রয়েছে।

অন্যদিকে, বায়ো-পিই স্ট্র ১০টি সূচকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে রয়েছে ওজোনস্তর ক্ষয়, অম্লীকরণ ও ধোঁয়াশা সৃষ্টি। কাগজের স্ট্র তিনটি এবং জীবাণুবিয়োজ্য প্লাস্টিকের স্ট্র দুটি সূচকে সর্বোচ্চ প্রভাবের জন্য চিহ্নিত হয়েছে।

প্লাস্টিকের স্ট্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক

দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার ২০২২ সালের নভেম্বরে ক্যাফে ও রেস্তোরাঁয় প্লাস্টিকের স্ট্র ব্যবহারে বিধিনিষেধ চালু করে। তবে জনসাধারণের অভিযোগ এবং নীতিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ২০২৩ সালের নভেম্বরে বিধিনিষেধ কার্যকরের জন্য নির্ধারিত ছাড়ের সময়সীমা অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হয়।

এ বিষয়ে আইনপ্রণেতা কিম উই-সাং বলেন, অকার্যকর বিকল্প উপকরণের ওপর নির্ভরশীল পরিবেশবান্ধব নীতির ব্যর্থতা সরকারের স্বীকার করা উচিত। একই ধরনের নীতিগত ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে হবে।

তার মতে, একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের সামগ্রিক ব্যবহার কমানোর ওপর নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বায়ো-পিই সাধারণত আখের মতো নবায়নযোগ্য উদ্ভিদভিত্তিক উৎস থেকে তৈরি করা হয়। তবে রাসায়নিক গঠনের দিক থেকে এটি প্রচলিত পলিইথিলিনের মতোই এবং স্বাভাবিকভাবে জীবাণুর মাধ্যমে পচে যায় না। ফলে উদ্ভিদভিত্তিক উৎস থেকে তৈরি হওয়া মানেই এটি জীবাণুবিয়োজ্য—এমন ধারণা সঠিক নয়।

পুনর্ব্যবহারেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা

কাগজের স্ট্রকে প্রায়ই পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য বিকল্প হিসেবে প্রচার করা হয়। কিন্তু গবেষণায় বলা হয়েছে, সব ধরনের স্ট্রই বাস্তবে পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখে পড়ে। আকারে ছোট হওয়ায় বর্জ্য বাছাইয়ের কেন্দ্রে এগুলো আলাদা করা কঠিন। এ ছাড়া স্ট্র’র ওপর ব্যবহৃত প্রলেপ ও আঠা পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত ১ হাজার ১ জন মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা প্লাস্টিকের স্ট্র পছন্দ করেন। তবে ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ক্রেতার অনুরোধে স্ট্র সরবরাহ করা উচিত। বিপরীতে, ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ এ নীতির বিরোধিতা করেছেন।

গবেষকেরা সুপারিশ করেছেন, দোকান, ক্যাফে ও রেস্তোরাঁয় কোনো ধরনের একবার ব্যবহারযোগ্য স্ট্রই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরবরাহ করা উচিত নয়। ক্রেতা চাইলে তবেই স্ট্র দেওয়া যেতে পারে।

গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায়, কোনো পণ্য কাগজের তৈরি কিংবা উদ্ভিদভিত্তিক হলেই সেটিকে সব দিক থেকে পরিবেশবান্ধব বলা যায় না। পণ্যের কাঁচামাল উৎপাদন, তৈরি, পরিবহন, ব্যবহার এবং ব্যবহারের পর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছু বিবেচনা করেই এর প্রকৃত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

, বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ