
কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ২১ বছর বয়সী এক তরুণীর। সম্প্রতি একটি বেসরকারি হাসপাতালে ছেলেসন্তানের জন্ম দিয়েছেন তিনি। তবে সন্তান জন্মের পরপরই নবজাতককে অভিযুক্ত যুবকের পক্ষের লোকজন নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীর পরিবার। পরে শিশুটিকে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি পরিবারের সদস্যদের। এ ঘটনায় বিচার না চেয়ে স্থানীয়ভাবে সালিসের মাধ্যমে মীমাংসার জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে অভিযুক্তের স্বজনদের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী তরুণীর বাবা মারা গেছেন ১২ বছর আগে। তাঁর মা অসুস্থ বৃদ্ধ নানির চিকিৎসার জন্য ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, এ সুযোগে একই গ্রামের এক যুবক বাড়িতে থাকা তরুণীকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। ভয়ে প্রথম দিকে কাউকে কিছু জানাননি তিনি।
পরে তরুণীর শারীরিক অবস্থায় পরিবর্তন ও নানা জটিলতা দেখা দিলে বিষয়টি তাঁর মায়ের নজরে আসে। মেয়ের কাছ থেকে বিস্তারিত জানার পর অভিযুক্ত যুবকের পরিবারকে ঘটনাটি জানান তিনি।
ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, প্রথম দিকে অভিযুক্তের স্বজনেরা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। উল্টো তরুণীকে নিয়ে নানা অপবাদ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে অভিযুক্ত যুবক ঘটনা স্বীকার করেন বলে দাবি পরিবারের। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও অভিযুক্তের পরিবার তা নাকচ করে দেয়।
পরিবারটির অভিযোগ, আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করতে চাপ দেওয়া হয়। অভিযুক্ত যুবকের বাবা প্রবাসে থাকায় তাঁর চাচা আপস-মীমাংসার উদ্যোগে যুক্ত হন বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্র।
তাদের ভাষ্য, একই গ্রামের প্রভাবশালী এক ব্যক্তির মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মাকে আর্থিক সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। একাধিকবার ওই ব্যক্তির বাড়িতে ডেকে নিয়ে তাঁকে মীমাংসার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ঘটনা প্রকাশ না করতে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছে পরিবারটি।
ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, স্থানীয় সালিসে অভিযুক্তের পরিবারের পক্ষ থেকে তিন লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নবজাতককে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগ
ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা জানান, গত শুক্রবার রাতে তরুণীর প্রসবব্যথা উঠলে তাকে চৌদ্দগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন তিনি। তবে সন্তান জন্মের পরপরই অভিযুক্তের পক্ষের লোকজন নবজাতককে নিয়ে যান বলে অভিযোগ পরিবারের।
পরিবারের দাবি, পরে তারা জানতে পারেন, ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তবে শিশুটিকে কার কাছে দেওয়া হয়েছে, বর্তমানে সে কোথায় রয়েছে কিংবা এ বিষয়ে কোনো আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না।
ভুক্তভোগীর বড় বোন বলেন, ‘শুক্রবার রাতে আমার বোন একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু আমাদের পারিবারিক অবস্থা ও সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে নবজাতককে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। বোনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার হিসেবে তিন লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।’
অভিযোগ অস্বীকার, পুলিশের ভাষ্য
সালিসে যুক্ত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামের ওই প্রভাবশালী ব্যক্তি বলেন, তিনি অভিযুক্ত যুবকের চাচার দোকানে বসে ছিলেন। অন্যরা বাড়ির ভেতরে গিয়ে সমঝোতা করেছেন বলে তিনি জেনেছেন। তবে সমঝোতায় কত টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। নবজাতক বিক্রির বিষয়েও কিছু জানেন না বলে দাবি করেন ওই ব্যক্তি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত যুবকের চাচা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গে বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানি না। কারা কীভাবে কী করেছে, তা আপনারা খোঁজ নেন।’
রোববার সন্ধ্যায় এ বিষয়ে জানতে চাইলে চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফ হোছাইন বলেন, এ ঘটনায় কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ দায়ের করলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে নবজাতকের বর্তমান অবস্থান, তাকে অন্যত্র হস্তান্তরের অভিযোগের সত্যতা এবং এ ঘটনায় কোনো আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।











