
মো. আলামিনুল হক : পৃথিবীর তাপমাত্রা অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে। কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ঠিক করবার কাজটি নিয়ে যত সময়ক্ষেপণ হবে, তত বাড়বে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। সেই ঝুঁকি এড়াবার পথ হলো, শিল্পোন্নত রাষ্ট্রসমূহকে এক টেবিলে বসিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো।
কয়লা এবং ডিজেল ব্যবহারের ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ বেড়ে গেছে মারাত্মকভাবে। কার্বনের এই নিঃসরণ যদি কমিয়ে আনা না-যায় তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে এক বার করে ৩০ কোটি মানুষ বসবাসের বিশাল এলাকা সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাবে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মাসিক বিজ্ঞানবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনের একটি সংখ্যায় প্রকাশিত এই খবর বিশ্ববাসীর জন্য রীতিমতো উদ্বেগজনক ও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে!
বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি হিসেবে কয়লা, ডিজেলের ব্যবহার যেভাবে বেড়ে গেছে, তাতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, কয়লা ও ডিজেলের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি নিঃসরণ ঘটে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের। এই গ্যাস শুধু বৈশ্বিক উষ্ণতাই বাড়াচ্ছে না, ওজোনস্তরকেও দুর্বল করে দিচ্ছে দিন দিন।
তাই প্রশ্ন উঠছে, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি কীভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব? আমরা জানি, বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে পালটে যাচ্ছে জলবায়ু। দক্ষিণ ও উত্তর মেরুর বরফ গলে সমুদ্রের পানির পরিমাণও গেছে বেড়ে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় শিল্পোন্নত দেশগুলো মাত্রাতিরিক্তভাবে ব্যবহার করছে কয়লা, ডিজেল। এই কার্বন-ডাই-অক্সাইডই পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত ওজোন স্তরকে।
এ কথা স্বীকার না-করে উপায় নেই, জীব জগতের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বায়ুমণ্ডলের গুরুত্ব সীমাহীন। কিন্তু দুশ্চিন্তার কারণ, পৃথিবীকে আবৃত করে থাকা বায়ুমণ্ডল দিন দিন তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলছে। মানুষ তার অপরিণামদর্শী কৃতকর্মের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল দিন দিন অনিরাপদ করে তুলছে। তারপরও পরিবেশ ও প্রকৃতিকে রক্ষার জন্য প্রাকৃতিকভাবেই কিছু রক্ষাবর্ম আছে।
ওজোন গ্যাস যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের শৃঙ্খলিত নিয়ম ভেঙে পড়বে। এলামেলো হয়ে যাবে সব কিছু। মানুষের ত্বকে ক্যান্সার, চোখে ছানি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদি ঝুঁকি বেড়ে যায়। শ্বেতবর্ণের মানুষের ত্বকে ক্যান্সারের জন্য অতিবেগুনি রশ্মি দায়ী। সামুদ্রিক প্রাণিকুলও অতিবেগুনি রশ্মির কারণে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। সে অবস্থা যদি সত্যিই দেখা দেয়, তাহলে মানুষের জন্য প্রকট হয়ে দেখা দেবে প্রোটিন ঘাটতি।
শুধু কি তাই, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধিতেও বাধা দান করে। ফলে শস্যের উৎপাদন হ্রাস পায় এবং বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা জানি, বৃক্ষরাজি কার্বন ডাই অক্সাইড শোধন করে। যদি উদ্ভিদ ও বনাঞ্চল ছোট হয়ে আসে তবে বায়ুমণ্ডলে ভেসে বেড়ানো কার্বন-ডাই-অক্সাইড পুরোটা শোধন হয় না, অবশিষ্ট কিছু অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় থেকে যায়। এভাবে অপরিশোধিত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে বায়ুমণ্ডলকে করে তুলছে অনিরাপদ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন করছে ত্বরান্বিত। আজ, আমরা আসলেই সেই মারাত্মক ঝুঁকির মুখোমুখি এসে পড়েছি।
পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রাখতে হলে ওজোন স্তরকে তার আগের অবস্থায় যেকোনো মূল্যে ফিরিয়ে আনতেই হবে। এজন্য প্রয়োজন মন্ট্রিল প্রটোকলের বাধ্যবাধকতাগুলো অনুসরণ করা। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এটা যদি ঠিকমতো পালন করা হয় তাহলে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি ওজোন স্তরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তাই আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী বাকি যেসব দ্রব্য রয়েছে সেগুলোর উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আমাদের এই পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার একটি প্রধান কারণ হলো জীবাশ্ম গ্যাস, যাকে আমরা বলি গ্রিনহাউস অ্যাফেক্ট। বায়ুতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো-কার্বন ও মিথেনসহ অন্যান্য গ্যাস এত বেশি বেড়ে গেছে যে, গত দেড় লাখ বছরের চেয়েও তা অনেক বেশি। আমাদের স্বীকার করতে হবে, এটি এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা।
সুখবর হলো, মাদ্রিদ সম্মেলনের পর পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টি ধীরে ধীরে অধিকাংশ দেশই গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে এনে এর বিকল্প উপায়ও বেছে নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে একদিন না একদিন সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গড়ে তোলা সম্ভব হবে বাসযোগ্য সুন্দর এক পৃথিবী।











