মঙ্গলবার, ১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ,৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

নারী দলের ফুটবল খেলা ঠেকাতে খেলার আগের দিনে মাঠের বেড়া ভাংচুর

এস রহমান সজীব, (জয়পুরহাট): জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে নারী ফুটবল দলের খেলা ঠেকাতে খেলা শুরুর আগের দিন বিকেলে হামলা চালিয়ে মাঠের ঘেরাও করা টিনের বেড়া ভাঙচুর করা হয়েছে। উপজেলার তিলকপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আজ বুধবার নারী দলের ফুটবল খেলা হওয়ার কথা ছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে এলাকার বিক্ষুব্ধ মুসল্লীরা একত্রিত হয়ে খেলার মাঠের টিনের বেড়া ভাঙচুর করেছেন। তবে আয়োজকরা দাবি করছেন, এলাকার কিছু মুরব্বি, চরমোনাই, জামায়াতে ইসলামী এবং স্থানীয় ক্বওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা নারীদের বেপর্দাভাবে ফুটবল খেলানো হচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে মাঠে ভাঙচুর করেছেন।

খেলার মাঠের ভাঙচুরের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভে প্রচার করা হয়। ওই মাঠে বুধবার  জয়পুরহাট ও রংপুর নারী টিমের ফুলবল ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। তিলকপুরের স্থানীয় টি স্টার সেবা সংগঠনের উদ্যোগে তিলকপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে টিন দিয়ে ঘিরে প্রায় দেড় মাস ধরে পুরুষদের ফুটবল খেলা চলছিল। খেলা দেখার জন্য প্রতিটি ম্যাচে মাটিতে বসে ৩০ টাকা ও চেয়ার বসে ৭০ টাকায় টিকিট বিক্রি করা হচ্ছিল।

নারী খেলার বিরোধীতাকারী একাধিক ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ওই মাঠে বুধবার থেকে নারীদের খেলা শুরু হবে ঘোষনা দিয়ে গত কয়েকদিন থেকে এলাকায় মাইকে প্রচার করা হয়। ধর্মীয়ভাবে নারীদের বেপর্দা করে ফুটবল খেলা জায়েজ না থাকায় স্থানীয় আলেম সমাজ থেকে শুরু করে তৌহিদী জনতা এবং স্থানীয় ক্বওমী মাদ্রাসা শিক্ষক ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছিল। এ বিষয়ে আয়োজকদের একাধিকবার মৌখিকভাবে সতর্ক করা হলেও তারা তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। এমতাবস্থায় নারীদের ফুবল খেলার বন্ধের দাবি তুলে মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে উপজেলার তিলকপুর রেলওয়ে স্টেশনের পূর্ব পাশে স্বাধীনতা চত্বরে শতাধিক তৌহিদী জনতা এবং স্থানীয় ক্বওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধন শেষে তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে তিলকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের টিনের বেড়া ভাঙচুর করে।

বিষয়টি স্থানীয় মাদ্রাসা ছাত্র মেজবাউল মন্ডল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভ করেন। সেখানে দেখা যায়, তিলকপুর রেলস্টেশনের সামনে স্বাধীনতা চত্বরে  মুসল্লী ও ক্বওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে সেখানে কয়েক জন মাওলানা বক্তব্য দেন।

সেখানে তারা বলেন,  গত কয়েক দিন থেকে জানতে পারছি এলাকার  মেয়েরা খেলা  নিয়ে তারা ব্যস্ত রয়েছেন। আমরা  মুসলমান  মেয়েদেরকে ঘরে রাখার জন্য আল্লাহতালা বলেছেন। তাঁরা পর্দার মধ্যে থাকবেন। সেই মেয়েদের এনে লেলিয়ে দিয়ে যুবকদের পাপাচার কাজে অগ্রসর করা হচ্ছে। যাঁরা সৎ কাজে আদেশ করবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে তারাই সফল কাম হবে। মেয়েদের লেলিয়ে দেওয়া কিভাবে মানতে পারি। যারা মেয়েদের লেলিয়ে দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে চান। আমি তাদের সর্তক করতে চাই আপনারা সাবধান হোন। আগামী দিনে মেয়েদের খেলা বন্ধ করুন। যদি আপনারা বন্ধ না করেন তাহলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। এরপর সেখান থেকে স্লোগান দিতে-দিতে তাঁরা তিলকপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গিয়ে খেলার জন্য দেওয়া টিনের বেড়া ভাঙচুর করেন।

তিলকপুর টি স্টার সেবা সংগঠন ও টুর্ণামেন্ট আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক খাজা মন্ডল বলেন, আজ বুধবার বিকেলে জয়পুরহাট-রংপুর নারী ফুটবল দলের ফুটবল খেলা হওয়ার কথা ছিল। সেই মোতাবেক আমরা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। স্থানীয় জামায়াত নেতা নজরুল ইসলাম, চরমোনাই নেতা আব্দুস সামাদ, মাসুম মৌলভীদের নের্তৃত্বে ক্বওমী মাদ্রাসা থেকে কোমলমতি ছাত্রদের নিয়ে এসে খেলার মাঠে হামলা চালিয়ে টিনের বেড়া ভেঙে দিয়েছে। দেশে তো নারীদের খেলা অবৈধ নয়। আমরা প্রশাসনকে অবগত করে খেলার আয়োজন করেছিলাম। ক্লাবের সদস্যদের সাথে আলোচনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় বাচ্চা হাজি ক্বওমী মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক হাফেজ মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ইসলাম নারীদের পর্দার বাহিরে কোন কাজ করা সমর্থন করে না। পর্দার খেলাপ হওয়ায় নারীদের খেলা হোক আমরা স্থানীয়ভাবে চাচ্ছিলামনা। এর পূর্বে তিলকপুরে কখনো নারীদের ফুটবল খেলা হয়নি। খেলাকে কেন্দ্র করে মাঠে মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা এবং অর্ধ উলঙ্গ হয়ে নারীদের খেলানো হলে যুবকদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটতে পারে। সেই কারনে খেলা বন্ধ করতে আমাদের সাথে স্থানীয় আলেম সমাজ, তৌহিদী জনতা এবং মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা একত্রিত হয়ে মানববন্ধন করে প্রতিবাদত করা হয় এবং পরে মাঠে গিয়ে টিনের বেড়া খুলে ফেলা হয়।

এ বিষয়ে তিলকপুর ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা নারীদের ফুটবল খেলার বিরুদ্ধে নয়। আমরা বেহায়াপনা ও অশ্লিলতার বিরুদ্ধে। আয়োজকরা খেলার আয়োজন করে নারীদের নিয়ে এসে গান বাজনা করে টিকিট কেটে যুবকদের সামনে নারীদেরকে অশ্লিলভাবে উপস্থাপন করা করছেন। এখানে জামায়াতে ইসলাম নয় বরং ব্যক্তিগতভাবে ইমানী দায়িত্ব থেকে স্থানীয় তৌহিদী জনতার সাথে একাগ্রতা পোষন করে এর বিরোধীতা করেছি। স্থানীয় ক্বওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা টিনের বেড়া খুলেছে আমি এর সাথে সংশ্লিষ্ট নয়।

আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিছুর রহমান বলেন, নারী টিমের ফুটবল খেলার আয়োজনের বিরুদ্ধে ভাঙচুরের বিষয়ে খবর পেয়েছি। এ বিষয়ে এখনো কেউ কোন প্রকার অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুরুল আলম বলেন, নারী ফুটবল খেলার বিষয়ে আজ বুধবার আয়োজকদের সাথে বসার কথা ছিল। তার আগেই মঙ্গলবার খেলার মাঠে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আমরা অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *