সোমবার, ২৪শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ,৯ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

আমরা ইরানের তেল সম্পদ পেতে যাচ্ছি: মার্কিন সিনেটর গ্রাহাম

যায়যায়কাল ডেস্ক: কয়েক দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে কথা বলে আসা অভিজ্ঞ রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ইরান সরকারকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ইরানের সরকার উৎখাত করার জন্য অর্থ ব্যয় করাটা সার্থক হবে।

দীর্ঘদিন অন্য দেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসা গ্রাহাম রোববার ফক্স নিউজকে বলেন, ‘এই শাসনের পতন যখন ঘটবে, তখন আমরা এক নতুন মধ্যপ্রাচ্য পেতে যাচ্ছি এবং আমরা বিপুল অর্থ আয় করতে যাচ্ছি।’

যেসব ব্যক্তি ট্রাম্প প্রশাসনের ইসরায়েলপ্রীতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে সরব, তাদের অন্যতম সিনেটর গ্রাহাম। তার বক্তব্যে এই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে ভেনেজুয়েলার বামপন্থী নেতা নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের অপহরণ এবং ইরানে হামলা এই দুটো কাজই করা হয়েছে দেশগুলোর তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে।

গ্রাহাম ফক্স নিউজকে বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা ও ইরানে বিশ্বের মোট তেলের ৩১ শতাংশ মজুত রয়েছে। আমরা এই ৩১ শতাংশ তেলের মালিকানায় অংশীদারত্ব পেতে যাচ্ছি। এটি চীনের জন্য দুঃস্বপ্ন। এটি একটি ভালো বিনিয়োগ।’

যুক্তরাষ্ট্র ‘ইরানকে ভাগ করে তেল নিতে চায়’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘তাদের পরিকল্পনা পরিষ্কার এবং উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। অবৈধভাবে আমাদের তেলসম্পদের দখল নেওয়ার জন্য তারা আমাদের দেশকে বিভক্ত করতে চায়। তাদের লক্ষ্য, আমাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা, আমাদের জনগণকে পরাজিত করা এবং আমাদের মানবিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা।’

সিনেটর গ্রাহাম জানান, আগামী দুই সপ্তাহে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা আরও বাড়বে। ইরানের বর্তমান শাসকশ্রেণিকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই লোকদের ‘পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে’ এবং হরমুজ প্রণালিতে আর কেউ কখনো যুক্তরাষ্ট্রকে ‘হুমকি দেবে না’।

ফক্স নিউজকে গ্রাহাম বলেন, ইরানের ‘শাসকগোষ্ঠী এখন মৃত্যুর পথে। তারা হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য হবে এবং তাদের পতন ঘটবে। যখন পতন হবে, তখন এমন শান্তি হবে, যা আগে কখনো হয়নি। আমরা এমন সমৃদ্ধি পেতে যাচ্ছি, যা কেউ কখনো কল্পনা করেনি।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর অনেক রিপাবলিকান নেতার মতো গ্রাহামও এর প্রতি সমর্থন জানান।

২ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত ইরান প্রত্যেক আমেরিকানের জন্য চরম হুমকি।’

ইরানের পক্ষ থেকে আসন্ন হুমকি ছিল দাবি করে দেশটিতে আক্রমণের ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং ইরানে এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

ইরানে হামলার কারণে জ্বালানি তেলের দাম এরই মধ্যে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সেই সঙ্গে যেসব উপসাগরীয় দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা রয়েছে, সেখানে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। এর ফলে তেল ও গ্যাস উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, জ্বালানি তেলের ট্যাংকারগুলো আটকে পড়েছে এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ইরানে হামলা চালানোর কয়েক সপ্তাহ আগে লিন্ডসে গ্রাহাম বেশ কয়েকবার ইসরায়েল সফর করেন। সেখানে তিনি দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

গ্রাহাম বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব সরকার আমাকে যা জানায় না, তারা (মোসাদ) আমাকে সেসব তথ্য দেবে।’

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব সফরের সময় গ্রাহাম ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও কথা বলেন। কীভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যুদ্ধের জন্য রাজি করানো যায়, সে বিষয়ে তিনি নেতানিয়াহুকে পরামর্শ দেন।

মার্কিন এই সিনেটর জানান, এরপর নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে এমন কিছু গোয়েন্দা তথ্য দেখান, যা তাঁকে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ যুদ্ধ শুরু করতে ‘প্ররোচিত’ করেছে। তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির পরিকল্পনা করছে, এই দাবি তুলে ইসরায়েল গত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামাতে প্ররোচনা দিয়ে আসছে। তবে ইরান বারবার বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে এবং অস্ত্র তৈরির কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।

সিনেটর গ্রাহাম সিরিয়া ও লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপেরও সমর্থক ছিলেন, যা দেশ দুটিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। হামলার পর লিবিয়া এখনো দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে বিভক্ত হয়ে আছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদের পতনের পর আহমেদ আল-শারা সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। বর্তমানে তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সিরিয়ার বেশির ভাগ অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। সিরিয়া যুদ্ধে ৩ লাখের বেশি মানুষ নিহত এবং অর্ধেক জনসংখ্যা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশটির এক দশকের বেশি সময়ের গৃহযুদ্ধ ইউরোপে পর্যন্ত শরণার্থী সংকট তৈরি করেছিল।

ফক্স নিউজের সাক্ষাৎকারে গ্রাহাম সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং সৌদি আরবকেও ইরানের ওপর হামলা চালানোর আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি চাই তারাও এই লড়াইয়ে যোগ দিক। আমরা তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করি। ইরান তাদের দেশে হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু তাদের তো ভালো সক্ষমতা আছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

গ্রাহামের এই সাক্ষাৎকার থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, হোয়াইট হাউস এরপর কিউবার দিকে নজর দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার এই ক্যাপটা দেখছেন? এতে লেখা ফ্রি কিউবা। অপেক্ষায় থাকুন। কিউবার মুক্তি আসন্ন। আমরা বিশ্বজুড়ে অভিযান চালাচ্ছি। আমরা খারাপ লোকদের সরিয়ে দিচ্ছি। এরপর কিউবার পালা।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং এক কিউবান অভিবাসীর সন্তান ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হাভানার সরকার পরিবর্তনের ইচ্ছার কথা গোপন রাখেননি। ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে মার্কিনপন্থী একনায়কের পতনের পর থেকে কয়েক দশক ধরে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অবরোধের মুখে রয়েছে।

২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় ওয়াশিংটন হাভানার সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক শুরু করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে সেই নীতি পরিবর্তন করেন।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ