রবিবার, ২রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,১৮ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড

‘পর্যটকদের কান্নাকাটি ও ছোটাছুটি দেখতে পেলেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি’

কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকালে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

আগুনে রিসোর্টটির বড় একটি অংশ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পরে সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আজিজ (৪২) বলেন, “সকাল সাতটার দিকে বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ শুনে বাড়ি থেকে ছুটে এসে দেখি, রিসোর্টটি দাউ দাউ করে জ্বলছে।”

জালিয়াপালং ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি কমান্ডার আজিজ জানান, আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে রিসোর্টের ভেতরে থাকা পর্যটকদের কান্নাকাটি ও ছোটাছুটি দেখতে পেলেও তাদের উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। আগুন ও ঘন ধোঁয়ার কারণে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, সমুদ্রতীরের খোলা পরিবেশে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে তীব্র বাতাস বইছিল। এতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড গরমে কাঠ শুকিয়ে যাওয়ায় আগুনের তীব্রতাও বেড়ে যায়। সকাল আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পৌঁছানোর আগেই রিসোর্টটির প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে যায় বলে তার ভাষ্য।

কাঠের মেঝে ও বিকল্প নির্গমনপথ নিয়ে প্রশ্ন

সরেজমিনে দেখা যায়, মেরিন ড্রাইভ সড়কের পূর্ব পাশে প্রায় ২০ শতক জমির ওপর রিসোর্টটির তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের চারপাশের দেয়াল ও খুঁটি ইট-পাথরের হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় তলার মেঝে কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি। নিচতলা থেকে ওপরের তলায় ওঠার সিঁড়িতেও লোহার কাঠামোর ওপর কাঠের তক্তা বসানো ছিল। তিনতলার ছাদ ছিল টিনের।

ভবনের পশ্চিম পাশে কাঠ দিয়ে সম্প্রসারিত অংশে ছিল একটি রেস্তোরাঁ। গাছের খুঁটির ওপর তৈরি এ অংশের বেশির ভাগ খুঁটি ঝাউ ও আকাশমণি গাছের। নিচতলার কয়েকটি কক্ষে রান্নাঘর, গুদাম ও কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। রিসোর্টটির পেছনে রয়েছে একটি সুপারিবাগান।

রিসোর্টের পেছনের সুপারিবাগানের মালিক নুরুল ইসলাম বলেন, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। পরে রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে বলে তার ধারণা।

তিনি মনে করেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার কাঠের মেঝেতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অতিথিদের নিচে নামতে সমস্যা হয়ে থাকতে পারে। তার ভাষ্য, ভবনটিতে বের হওয়ার বিকল্প পথ ছিল না। কেউ কেউ বাথরুমে আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পাননি।

তবে আগুনের প্রকৃত কারণ এবং ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

উদ্ধার করতে পারেননি স্থানীয় বাসিন্দারা

অগ্নিকাণ্ডে রিসোর্টের উত্তর পাশের একটি দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানটির মালিক গিয়াস উদ্দিন (৪০) জানান, তার চা-কফির দোকানের একটি ফ্রিজ ও কাঠের তৈরি কিছু অংশ পুড়ে গেছে।

তিনি বলেন, সকাল সাতটার দিকে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে এসে রিসোর্টের ভেতরে থাকা পর্যটকদের কান্নাকাটি ও ছোটাছুটি করতে দেখেন। কিন্তু আগুনের তীব্রতা ও ধোঁয়ার কারণে ভেতরে ঢুকে তাদের উদ্ধারের কোনো উপায় ছিল না।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ইনানী সৈকতের মেরিন ড্রাইভ এলাকায় এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আগে দেখেননি তারা। এ ঘটনায় আগুনের সূত্রপাত, গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপত্তা এবং ভবনের জরুরি নির্গমনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তদন্ত কমিটি গঠন

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক জানান, এ ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক।

এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা পর্যটনকেন্দ্রের হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমনপথ এবং কার্যকর অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ