সোমবার, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ,২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মানবপাচার চক্রের শিকার যুবকের ওপর লোমহর্ষক নির্যাতন

Oplus_0

মিনহাজ আলী, শিবগঞ্জ (বগুড়া) : বগুড়ার শিবগঞ্জের ধাওয়াগীর মিল্কিপুর গ্রামের নুরুল ইসলাম(২৭)। তিনি দিনমজুরের কাজ করতেন । ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে অভাব অনটনে চলছিল নুরুলের সংসার। এরই মধ্যে পরিচয় হয় মানবপাচার সিন্ডিকেটের এক সদস্যের সঙ্গে।

চক্রের সদস্যরা বৈধ উপায়ে ভালো বেতনে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রলোভন দেখায় তাকে। পরে, সুদে টাকা ধার নিয়ে ঐ চক্রের সদস্যের হাতে তুলে দেন। তারপর থেকে তার ভাগ্যে নেমে আসে অন্ধকার। পথে পথে নির্যাতন সহ্য করে মালেশিয়া পৌছিলেও সেখানেও বেঁধে রেখে করা হয় শারিরীক নির্যাতন।

ভিডিও কলে পরিবারকে নির্যাতনের এসব দৃশ্য দেখিয়ে টাকা দাবি করে তারা। অবশেষে তিনমাস জেল খেটে নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে হাইকমিশনের মাধ্যমে গত ১৩ জুন দেশে ফেরেন নুরুল ইসলাম।

গত বৃহস্পতিবার উপজেলার মিল্কিপুর গ্রামে গেলে এভাবেই নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন মালয়েশিয়া ফেরৎ নুরুল ইসলাম।

এ সময় তিনি যায়যায় কালকে বলেন, আমার প্রতিবেশী ফারুক হোসেন(৬০) তার বিহান (ছেলের শাশুড়ি) তানজিলা বেগম(৪৫) এর মাধ্যমে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বৈধ ভাবে আমাকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে৷ তখন আমি রাজি হই। এরপর আমি বিভিন্ন মানুষের নিকট ও এনজিও থেকে সুদে টাকা ঋণ নেই। গত জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে ফারুকের হাতে ৫ লাখ টাকা দেই। এরপর সে বলে ১২ জানুয়ারি তোমার ফ্লাইট। এসময় তাদের থেকে পাসপোর্ট ও ভিসা চাইলে তারা জানান, বিমানবন্দরে গিয়ে দেয়া হবে। বিমান বন্দরে গেলে তারা আমাকে ভারতের ভিসা দিয়ে জোর করে কলকাতায় পাঠায়।

তিনি আরও বলেন, সেখানে আমার মতো আরও ৫ জন ভুক্তভোগী ছিলো। তাদের সঙ্গে সেখান থেকে আমাকে ভিয়েতনামে পাঠায়। সেখানে দেখি আমার মতো আরও অনেককে নিয়ে আসা হয়েছে। সেখানে ১৪ দিন আমাদের সবাইকে আটকে রাখা হয়। এরপর ভিয়েতনাম থেকে সিমান্ত এলাকা দিয়ে চোরাই পথে থাইল্যান্ডে নেয়া হয় আমাদের। এসময় দিনের পর দিন আমাদের না খেয়ে রাখে। কাছে থাকা টাকা পয়সা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। থাইল্যান্ড থেকে নৌকা যোগে তাঁরা আমাদের মালেশিয়া পাঠায়। এরপর আমাদের একটি ঘরে আটকে রেখে শারিরীক নির্যাতন চালাতে থাকে। এসময় তাঁরা ফারুকের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বললে ফারুক ও তানজিলা আমাকে মারার আদেশ দেন। এবং টাকা আদায় করতে বলেন। আমার বাবা সুদে ধার নিয়ে ফের ১ লাখ টাকা ঐ চক্রকে দেন। মাস খানিক ঐ ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন করার পর মালেশিয়া পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে জেল হাজতে পাঠান। তিন মাস জেল খেটে বাংলাদেশি হাইকমিশনের মাধ্যমে গত ১৩ জুন আমি দেশে ফিরি।

নুরুল ইসলামের বাবা দিনমজুর রেজাউল মন্ডল(৫২) বলেন, আমার ছেলেকে বিদেশে নির্যাতন করা অবস্থায় আমি থানায় অভিযোগ দিয়েছিলাম, কিন্তু কোন লাভ হয়নি। পরে ২১ এপ্রিল বগুড়া আদালতে মানব পাচার আইনে ফারুক ও তানজিলাসহ ৪ জনের নামে মামলা দায়ের করি।

এ সময় গ্রামবাসীরা জানান, বর্তমানে ঋণে জর্জড়িত নুরুল ইসলামের পরিবার। এনজিওর কিস্তি ও সুদের টাকা পরিশোধের চাপ, অপর দিকে বেঁচে থাকার লড়াই। গ্রামের মানুষরা বাড়ি বাড়ি চাল আদায় করে তাদের দিচ্ছেন। কেউ ভাত এনে খেতে দিচ্ছেন। এভাবেই চলছে তাদের সংসার।

অভিযুক্ত ফারুক মিয়া জানান, নুরুল ইসলাম বিদেশ যেতে চাইলে আমি বলি আমার বিহান (ছেলের শ্বাশুড়ি) তানজিলা বিদেশে লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারে। আমি তাকে শুধু এই লাইন দেখে দিছি। এছাড়া আর কিছুনা।

অভিযুক্ত তানজিলা বেগম বলেন, নুরুল ইসলামের ভাত খাওয়ার থালি নাই ও কি করে ৬ লাখ টাকা আমাকে দেবে? তাঁর সঙ্গে সাড়ে তিন লাখ টাকার কন্টাক্ট হয়েছিলো। টাকা দিতে পারেনি দেখে তাকে এজেন্টের লোকজন নির্যাতন করেছে। এ ব্যাপারে আমরা তার সাথে গ্রামে ও থানাতে মীমাংসায় বসতে চাই, কিন্তু সে রাজি হচ্ছে না।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বগুড়ার সাব ইন্সপেক্টর সবুজ মোহাম্মদ জানান, মামলাটি তদন্ত চলছে। আমি এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে বাদির অভিযোগ সত্য বলে মনে হয়েছে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

, বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *