বৃহস্পতিবার, ৬ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,২২শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

সৌদিতে ৬ মাসে বাংলাদেশি সহ ৫৯ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

যায়যায়কাল ডেস্ক: চলতি ২০২৬ সালে সৌদি আরবে উচ্চ হারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে বাংলাদেশি ও আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকসহ অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড রেকর্ড করেছে ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস (ইএসওএইচআর)।

অতিসম্প্রতি সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তারা প্রথম ছয় মাসের ওই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নন।

ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস মূলত জার্মানির বার্লিনভিত্তিক একটি স্বাধীন, অলাভজনক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। এটির মূল প্রশাসনিক সদর দপ্তর বার্লিনে অবস্থিত। তবে যুক্তরাজ্য (লন্ডন) ও লেবাননেও (বৈরুত) এর প্রতিনিধি ও সহযোগী শাখা রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাটির পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এ বছরও সৌদি আরব বৈশ্বিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তালিকায় শীর্ষস্থানেই রয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে এই শাস্তি বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।

সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে চলতি বছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছেছে। পূর্ববর্তী যেকোনো শাসনামলের তুলনায় এটি একটি রেকর্ড।

পরিসংখ্যানে মৃত্যুদণ্ড ও নাগরিকদের জাতীয়তা

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৭টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। এটি ভিনদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে সৌদি কর্তৃপক্ষের এই সর্বোচ্চ সাজার ব্যাপক ও ধারাবাহিক প্রয়োগের চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, উল্লিখিত সময়ে মোট ৫৯ বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সাজার প্রায় ৫৪ শতাংশ। এর বিপরীতে সৌদি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সংখ্যা ছিল ৪৯, যা মোট সংখ্যার ৪৬ শতাংশ।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকায় সৌদি আরব ছাড়াও বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া, উগান্ডা ও আফগানিস্তানের নাগরিকেরা রয়েছেন।

অপরাধের ধরন

কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডগুলোর পেছনে থাকা অপরাধের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে ৭১টি মৃত্যুদণ্ড, যা মোট সাজার ৬৬ শতাংশ;

হত্যাকাণ্ডের মামলায় ২৫টি মৃত্যুদণ্ড, যা মোট সাজার ২৩ শতাংশ;

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় ৯টি মৃত্যুদণ্ড, যা মোট সাজার ৮ শতাংশ; এবং

অন্যান্য মামলায় ৩টি মৃত্যুদণ্ড, যা মোট সাজার ৩ শতাংশ।

এ হিসাব থেকে বোঝাই যায়, চলতি বছরের প্রথমার্ধে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডগুলোর মধ্যে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের হারই ছিল সবচেয়ে বেশি।

এ ছাড়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টি (৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ) এমন অপরাধের জন্য দেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক ছিল না।

সাজার প্রকৃতির দিক থেকে ৮৪টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বিচারকদের একক বিবেচনামূলক ক্ষমতা বা ‘তাজির’ শাস্তির ভিত্তিতে, যা মোট সাজার ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ।

পাশাপাশি ১০৮টি মামলার মধ্যে ৯১টি ক্ষেত্র সম্পর্কে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস বা অন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা আগে থেকে কোনো তথ্য জানতে বা নথিবদ্ধ করতে পারেনি। মামলাগুলো মোট সংখ্যার ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ।

এর ফলে এটি স্পষ্ট, সৌদি আরবে স্বচ্ছতার অভাব অব্যাহত রয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে।

প্রধান প্রবণতা: মাদক-সংক্রান্ত মৃত্যুদণ্ড

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে মাদক অপরাধের আধিপত্য বজায় ছিল। নথিবদ্ধ ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৭১টিই মাদক অপরাধে কার্যকর করা হয়েছে, যা সামগ্রিক সাজার ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধে ৪৯টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে, যা মোট সাজার ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

এ অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন দেশের নাগরিক হলেও সবচেয়ে বেশি ছিলেন ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেনের।

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মৃত্যুদণ্ড

বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশেষায়িত ফৌজদারি আদালত থেকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় দণ্ডিত হওয়া ব্যক্তিদেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। এটি মোট সাজার প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

এসবের মধ্যে অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল গত জুনে সৌদ আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা। আইনবহির্ভূত আটকাদেশ–সংক্রান্ত জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ এর আগে তাঁর এ আটকাদেশকে বেআইনি ও অযৌক্তিক বলে গণ্য করেছিল।

আবার ৯ এপ্রিল সৌদি কর্তৃপক্ষ আলী আল-সুবাইতি নামের এক অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল মাত্র ১২ বছর বয়সে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া।

বর্তমান পরিস্থিতি

ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে, শৈশবে করা কথিত অপরাধের জন্য এখনো অন্তত পাঁচজন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

জাতিসংঘের ওই ওয়ার্কিং গ্রুপ তাদের কয়েকজনের আটকাদেশকে বেআইনি ঘোষণা করে মুক্তির আহ্বান জানিয়েছিল। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের জীবন রক্ষায় বা জাতিসংঘের সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়নি।

এ ছাড়া স্রেফ শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের অভিযোগে দণ্ডিত আরও ৪৯ জন বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন শেখ সালমান আল-আওদা ও শেখ হাসান আল-মালিকি নামের দুজনও। ২০১৮ সাল থেকে সরকারি কৌঁসুলিরা তাদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে এলেও আজ পর্যন্ত তাদের বিচারপ্রক্রিয়া অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস আরও নথিবদ্ধ করেছে, সৌদি আরবের কারাগারগুলোয় এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে বন্দী আছেন। তাদের মধ্যে খামিস মুশাইত কারাগারে ৫৮ জন ইথিওপীয়, নাজরান কারাগারে আরও পাঁচ ইথিওপীয় ও পাঁচ সোমালীয় এবং তাবুক কারাগারে আটজন মিসরীয় রয়েছেন।

সংস্থাটি এসব বন্দীর মামলার ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি ব্যাপক চিত্র নথিবদ্ধ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে—পেশাদার দোভাষীর অনুপস্থিতি, আইনি সহায়তা না পাওয়া, বিচারিক প্রক্রিয়া বুঝতে না–পারা ও আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ না দেওয়া।

সংস্থার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা বন্দীরা জানিয়েছেন, তারা প্রতিনিয়ত মৃত্যুদণ্ডের আতঙ্কের মধ্যে বাস করছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তারা দেখেছেন, ‘ডেথ রো’-এর বন্দীদের সামান্য কিছুদিনের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা রেখে এবং বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে হঠাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ