বৃহস্পতিবার, ১২ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,২৭শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

নেপালে ৫,২০০ মিটার উঁচুতে হিমবাহধস, আধা ঘণ্টায় নদীর পানি বাড়ে ৩০ ফুট

যায়যায়কাল প্রতিবেদক: তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালে বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে একটি হিমবাহের ধস বড় কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের ধারণা, হিমবাহের নিচের একটি বড় অংশ ভেঙে শত শত মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ার ফলে এ বিপর্যয় ঘটেছে।

মার্কিন কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্ল্যানেট ল্যাবস’-এর পাঠানো ছবি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এ কথা জানিয়েছেন।

ঠিক কী কারণে হিমবাহটি ধসে পড়ল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নেপালের সরকারি কর্মকর্তাদের ধারণা, দুর্যোগের ঠিক কয়েক মিনিট আগে ওই অঞ্চলে আঘাত হানা একটি ভূমিকম্প এর পেছনে দায়ী হতে পারে।

সীমান্তের দুই পারের কর্তৃপক্ষেরই আশঙ্কা, প্রাণহানির সংখ্যা বর্তমান অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত নেপালে ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। নেপাল সরকার জানিয়েছে, এখনো ৩০০ জনের বেশি পর্যটক নিখোঁজ। অন্যদিকে চীন সীমান্তে ৩ জনের মৃত্যু ও ৫৫৮ জন নিখোঁজ থাকার কথা বলা হয়েছে।

প্ল্যানেট ল্যাবসের পাঠানো দুর্যোগের আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবিগুলো পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। ছবিতে দেখা গেছে, ওই অঞ্চলের চিরসবুজ পাহাড়গুলো এখন বাদামি রঙের ধ্বংসস্তূপ ও পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।

ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্বের অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্ত বলেন, ‘এটি নিশ্চিত যে হিমবাহের অগ্রভাগের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার মাধ্যমেই ঘটনার সূত্রপাত হয়। এর সঙ্গে সম্ভবত বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলিমাটিও নিচে নেমে এসেছে।’

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির সহযোগী অধ্যাপক ও ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার জানান, স্যাটেলাইট ছবি দেখে মনে হচ্ছে, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় প্রচুর বরফ গলেছিল।

ড্যান শুগার বলেন, ‘এ উপত্যকার কিছু হিমবাহ গতকালও (গত মঙ্গলবার) বরফে ঢাকা ছিল। অথচ আজ সেগুলোর ওপর শুধু উন্মুক্ত বরফস্তর দেখা যাচ্ছে। এর সহজ অর্থ হলো, যদিও আমি এখনো আবহাওয়াকেন্দ্রের কোনো তথ্য পাইনি, সেখানকার আবহাওয়া সম্ভবত উষ্ণ ছিল।’

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে নেপালের বরফাবৃত পর্বতগুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে বলে ২০২৩ সালে জানিয়েছিল জাতিসংঘ।

সংস্থাটি সে বছর আরও জানায়, বিশ্বের দুই বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশ—ভারত ও চীনের মধ্যে অবস্থিত নেপালের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় গত এক দশকে ৬৫ শতাংশ দ্রুতগতিতে গলেছে।

ড্যান শুগার আরও বলেন, ‘আজ সকালে (গতকাল বুধবার) প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্রে আমি যা দেখেছি, তা হলো প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে তারও প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়েছে।’

এ বিপর্যয়ের পেছনে ওই অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণকাজও একটি বড় কারণ হতে পারে উল্লেখ করে এই ভূবিজ্ঞানী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন এখানে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না, তা আমরা নিশ্চিতভাবেই অদূর ভবিষ্যতে খতিয়ে দেখব।’

‘আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফ-পাথরের ধস

নেপালের রসুয়া নামের পাহাড়ি জেলাটির জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এ এলাকায় বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্ত ক্রসিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) উত্তর-পূর্বে একটি ভূমিধসের কারণে লেন্দে নদীতে এ ‘হিমবাহ-মিশ্রিত বন্যা’ দেখা দেয়।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে ভূকম্পনের কারণে তুষারধস এবং এর জেরে এ বন্যা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। তবে ওই সংস্থার ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখরেল জানান, ভূমিকম্পই এ ট্র্যাজেডির মূল কারণ কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

প্ল্যানেট ল্যাবসের ছবিগুলো পর্যালোচনা করে প্রকাশ পোখরেল বলেন, ‘নেপাল অংশে একটি বরফ ও পাথরের ধসের কারণেই এ আকস্মিক বন্যা হয়েছে।’

হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলজুড়ে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস এবং খরার তীব্রতা ও প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ জানিয়েছে, এই অঞ্চলে পানি, ভূমি ও বায়ুমণ্ডলের দ্রুত পরিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংস্থাটি জানায়, বুধবারের আকস্মিক বন্যার ফলে ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় তীব্রগতিতে পানি, পলি ও বিশালাকার পাথর বয়ে গেছে। এর ফলে ভাটির দিকে গালছি এলাকায় নদীর পানির স্তর মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রায় ৯ মিটার (৩০ ফুট) পর্যন্ত বেড়ে যায়।

উল্লেখ্য, এ বন্যা ও ভূমিধসকে ২০১৫ সালের প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর নেপালের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে।

এ দুর্যোগের কারণ জানাতে গিয়ে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বুধবার দেশটির পার্লামেন্টে বলেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে একটি ভূমিকম্প হয়। এর ৩ মিনিটের মাথায়, অর্থাৎ ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তিনি বলেন, ‘তবে এটা আমাদের যাচাই করে দেখতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ