
যায়যায়কাল ডেস্ক: ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচনে সবচেয়ে নজরকাড়া ঘটনাগুলোর একটি ছিল দেশটির প্রধান দুই আরব দলের জোরালো অবস্থান।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানাতে দল দুটির সমর্থকেরা রেকর্ডসংখ্যক ভোট দিয়েছেন।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তবে ইসরায়েলের সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর বুথফেরত জরিপ থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, আরব দল দুটি এবার বড় সাফল্য পেতে যাচ্ছে। দল দুটি হলো সামাজিকভাবে রক্ষণশীল ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রাআম) এবং বামপন্থী জয়েন্ট লিস্ট।
বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, দল দুটি ইসরায়েলের পার্লামেন্টে রেকর্ডসংখ্যক আসন পেতে পারে। এতে দেশটির প্রধান দুই জোটের মধ্যে কারা সরকার গঠন করবে, তা নির্ধারণে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বুথফেরত জরিপ হলো ভোট দেওয়ার পর কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসা ভোটারদের ওপর চালানো সমীক্ষা। এতে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তারা কাকে ভোট দিয়েছেন। তাদের উত্তর বিশ্লেষণ করে নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
রাআমের নেতা মনসুর আব্বাস টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আরব ভোটারদের এই উপস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, তারা নিজেদের ‘হতাশা ও নিরাশা’কে ‘আশায়’ রূপান্তর করেছেন। ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই আরব।
আব্বাস বলেন, তিনি ‘সম্ভাব্য সব উপায়ে’ নেতানিয়াহুর সরকারের পরিবর্তন চান। তার প্রথম অগ্রাধিকার হলো এমন একটি সরকার গঠনের সুযোগ নিশ্চিত করা, যার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
আরব দলগুলোর এই সাফল্য সরকার গঠনে তাদের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। তবে ইসরায়েলে আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠন এখনো জটিল বিষয়। অনেক ইসরায়েলি ইহুদি মনে করেন, পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য আরব আইনপ্রণেতাদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের বেশির ভাগই ফিলিস্তিনিদের বংশধর। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধের সময় এই ফিলিস্তিনিরা নিজেদের ঘরবাড়ি না ছেড়ে সেখানে থেকে গিয়েছিলেন।
এখন আরব নাগরিকদের বেশির ভাগই ইহুদি ইসরায়েলিদের থেকে আলাদা শহরে বাস করেন। তারা সহিংসতা ও আবাসনসংক্রান্ত বৈষম্যমূলক নীতির শিকার হন।
ইসরায়েলের ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয়সহ নানা বিষয়ে দেশটির আরবদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। এসব কারণে কয়েক দশক ধরে অনেক আরব ভোটার ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।
তবে এ সপ্তাহে অনেক আরব ভোটার বলেছেন, পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি নেতানিয়াহুর আচরণে তারা ক্ষুব্ধ। ইসরায়েলের ভেতরেও ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা হয় বলে মনে করেন তারা। এ জন্য তারা সরকারের বিভিন্ন নীতিকে দায়ী করেন। নির্বাচনী প্রচারজুড়েও নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে আরববিদ্বেষী মনোভাব কাজে লাগিয়ে ভোট চেয়েছেন।
গত মঙ্গলবার লোদ শহরে ভোট দেন ৩৯ বছর বয়সী আরব-ইসরায়েলি খুলুদ আল-জেইনাতি। শহরটিতে ইহুদি ও আরব—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। সেখানকার ভোটকেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
খুলুদ বলেন, ‘আমি খুব আশাবাদী। মানুষ বুঝতে পারছে, এটা সাধারণ কোনো নির্বাচন নয়। আমরা পরিবর্তন চাই।’
এই আরব-ইসরায়েলি আরও বলেন, ‘জীবনের নানা ক্ষেত্রে আরব সম্প্রদায়কেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়। তাই আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে ভোটে অংশ নেওয়া জরুরি।’
খুলুদ বলেন, ‘আমি আশা করি, পরবর্তী সরকার কেমন হবে, তা ঠিক করতে আমাদের ভোট সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমাদের সবার জীবনে ভালো পরিবর্তন আনবে।’
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নজিরবিহীন ভালো ফলের আভাস পাওয়া দুই আরব দলের মধ্যে শুধু রাআমই কেবল এর আগে দেশটির জোট সরকারে যোগ দিয়েছিল। ২০২১ সালে দলটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের স্বল্পস্থায়ী নেতানিয়াহুবিরোধী জোট সরকারের অংশ ছিল তারা।
রাআম ওই সরকারের শরিক হওয়ায় অনেক ডানপন্থী ইহুদি ভোটার ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। প্রায় এক বছর পর বেনেটের সরকারের পতন হয়। এরপর ওই ভোটাররা নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেন। তিনি ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে উগ্র ইহুদিবাদী সরকার গঠন করেন।
এখন নেতানিয়াহুর সেই সরকারেরই ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আর যে নির্বাচনী ফল এই সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে আরব ভোটারদের বিপুল অংশগ্রহণ।











