
যায়যায়কাল প্রতিবেদক: বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
দলের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সম্মতিপত্রেও মির্জা ফখরুল স্বাক্ষর করেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি।
এর আগে গত ২ আগস্ট বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় আসে।
২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট।
ইতিমধ্যে বিএনপি নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। রোববার সকালে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সিইসির দপ্তর থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
একই প্রার্থীর নামে একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যেকোনো একটি মনোনয়নপত্র বৈধ হলেই ওই ব্যক্তি বৈধ প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনেও দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। গত ২৪ জুলাই তার পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়। এরপর থেকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়।
মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরী কে?
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব পদে কে আসবেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রায় ১৬ বছর ধরে দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন মির্জা ফখরুল। ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর থেকে তিনি বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের লন্ডনে অবস্থানের সময় দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন সময়ে তাকে কারাবরণও করতে হয়েছে।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তার উত্তরসূরি হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এবং যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে।
তবে দলীয় সূত্রগুলোর মতে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে বা কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে প্রথমে একজনকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
রুহুল কবির রিজভী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি এবং তাকে মন্ত্রিসভাতেও রাখা হয়নি। এ কারণে মহাসচিবের পদ শূন্য হলে তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিএনপির কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা মনে করছেন।
অলি আহমদকে প্রার্থী করল বিরোধী জোট
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যজোট। জোটটি বিএনপির সাবেক নেতা ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করেছে।
রোববার মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি অনীহা দেখিয়েছে। বিএনপি সংস্কারের পথে হাঁটলে সরকার ও বিরোধী দল মিলে রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থী দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু সে উদ্যোগ না থাকায় ১১-দলীয় জোট আলাদাভাবে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অলি আহমদ বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা ও পরীক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তিনি জোটের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁর ভাষ্য, এই মনোনয়নের মাধ্যমে জনগণকে একটি বার্তা দিতে চায় ১১-দলীয় ঐক্য—দেশের অভিভাবকত্বের জন্য তিনি যোগ্য।
জামায়াতের শীর্ষ নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের হিসাব তাদের কাছে মুখ্য নয়। বরং নির্বাচনে অংশ নিয়ে কার্যকর বিরোধী দলের উপস্থিতি দৃশ্যমান করাই তাদের উদ্দেশ্য।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সবক্ষেত্রে রাজনীতি স্বচ্ছ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়া উচিত। এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের গতি ফিরে আসবে।
যেভাবে হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে। প্রতিটি সংসদ সদস্য একটি করে ভোট দিতে পারেন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ কক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যেতে পারে। ফলে সংসদে ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ফলাফল সাধারণত আগেই নির্ধারিত থাকে।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মাত্র একবার ভোটাভুটি হয়েছে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। এরপর আর কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দল প্রার্থী না দেওয়ায় ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি।
এবার সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তারপরও বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবার ভোটাভুটির দিকে যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছে। তফসিল ঘোষণার দিন ৩৪৯ জন ভোটারের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষে ভোট গ্রহণ হবে।
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবারের নির্বাচন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণত আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হলেও এবারের নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। একদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব পদে নতুন নেতৃত্বের সমীকরণ তৈরি হবে। অন্যদিকে সংসদে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও অলি আহমদকে প্রার্থী করে বিরোধী জোট নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে।
ফলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পাশাপাশি বিএনপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং সরকার-বিরোধী দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকেও এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।











