শনিবার, ১৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন, আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়ানোর শঙ্কা

যায়যায়কাল ডেস্ক: প্রতিবেশী ইথিওপিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে ইরিত্রিয়া। দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ, পারস্পরিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকার নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে দুই দেশের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটেছে। এতে আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে বৃহত্তর সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উত্তর ইথিওপিয়ায় দেশটির সরকারি বাহিনী ও বিরোধী সশস্ত্র জোটের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার মধ্যেই এ কূটনৈতিক বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটল। আদ্দিস আবাবার অভিযোগ, ইরিত্রিয়া সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে।

২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানির পর দেশটিতে এটিই সবচেয়ে তীব্র সংঘাত বলে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এবারের সংঘাত শুধু ইথিওপিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যেও অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

কেন কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করল ইরিত্রিয়া?

বৃহস্পতিবার ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়ার রাজধানী আসমারায় নিজেদের দূতাবাস বন্ধ এবং ইরিত্রিয়ার ১০ কূটনীতিককে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়। এর পরপরই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয় ইরিত্রিয়া।

ইরিত্রিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ইথিওপিয়ার পদক্ষেপের জবাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।

বিবৃতিতে ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে শত্রুতামূলক নীতি অনুসরণ, ইরিত্রিয়ার উপকূলীয় এলাকায় হস্তক্ষেপ এবং ইথিওপিয়া সরকারের বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ আনা হয়।

অন্যদিকে, ইথিওপিয়াও ইরিত্রিয়ার বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ করেছে। তবে উভয় দেশই একে অপরের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থলবেষ্টিত ইথিওপিয়ার লোহিত সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার পাওয়ার প্রচেষ্টা এবং তিগ্রের বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে ইরিত্রিয়ার সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

মিসর ও সুদানের সঙ্গে ইথিওপিয়ার সম্পর্কেও উত্তেজনা

ইরিত্রিয়ার পাশাপাশি মিসর ও সুদানের বিরুদ্ধেও তিগ্রের বিদ্রোহীদের সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে ইথিওপিয়া। এতে দেশ দুটির সঙ্গে ইথিওপিয়ার আগে থেকেই টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ইথিওপিয়ার গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম (জিইআরডি) প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মিসরের সঙ্গে বিরোধ চলছে। নীল নদের পানির প্রবাহ ও পানিসম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন মিসর এই বাঁধকে নিজেদের জন্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে।

সম্প্রতি দুই দেশই পরস্পরের কূটনীতিক বহিষ্কার করেছে। বৃহস্পতিবার ইথিওপিয়ার এক কূটনীতিককে বহিষ্কারের নির্দেশ দেয় কায়রো। এর আগে আদ্দিস আবাবাও একজন মিসরীয় কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছিল।

মিসরের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আল-কাহেরা নিউজের বরাতে জানা যায়, দেশটির এক কর্মকর্তা ইথিওপিয়ার পদক্ষেপকে দুঃখজনক ও অযৌক্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কূটনীতিক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, সুদানের গৃহযুদ্ধেও ইথিওপিয়ার ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ রয়েছে। সুদানের সামরিক বাহিনী-সমর্থিত সরকার অভিযোগ করেছে, ইথিওপিয়া তাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করছে। তবে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে আদ্দিস আবাবা।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের আফ্রিকা কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ গবেষক আহমেদ সোলেইমান আলজাজিরাকে বলেন, ইথিওপিয়া ও সুদানের সংঘাত ক্রমেই পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। দুই দেশের সরকারই একে অপরের ভূখণ্ড থেকে বিরোধী শক্তিকে আশ্রয় ও অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ তুলছে। একই সঙ্গে নীল নদ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে মিসরও এই উত্তেজনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।

উত্তর ইথিওপিয়ায় তীব্র লড়াই

গত সপ্তাহ থেকে উত্তর ইথিওপিয়ার তিগ্রে নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী বাহিনীর সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষ চলছে। তিগ্রে, আমহারা ও আফার—এই তিন অঞ্চলে লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে।

আলজাজিরার ইথিওপিয়া ব্যুরোপ্রধান মোহাম্মদ তাহা তাওয়াকেল জানিয়েছেন, সরকারি বাহিনী তিগ্রে অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তারা বেশ কয়েকটি শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং আঞ্চলিক রাজধানী মেকেলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

অন্যদিকে, আফার অঞ্চলে বিদ্রোহীদের দখলে থাকা ইরেবতি শহর পুনর্দখলের দাবি করেছে সরকারপন্থী একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনীর বিমান সহায়তার প্রশংসা করে আরও অগ্রসর হওয়ার ঘোষণা দেয়।

তবে সরকারি বাহিনীর অগ্রগতি সত্ত্বেও তিগ্রে অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় ইরিত্রিয়ার সঙ্গে বিদ্রোহীদের শক্তিশালী যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থা এখনো রয়েছে বলে জানিয়েছেন তাওয়াকেল।

তিগ্রের আদওয়া, আকসুম, শিরে ও মেকেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতেও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু বাসিন্দা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আমহারা ও আফার অঞ্চলের দিকে পালাতে শুরু করেছেন।

এদিকে, বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো সংঘাতের প্রভাব রাজধানী আদ্দিস আবাবাতেও পৌঁছেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বার্তা সংস্থা এএফপিকে এক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ছোট আকারের ড্রোন থেকে বিস্ফোরণটি ঘটার সম্ভাবনাই বেশি।

সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, এর আগে বিদ্রোহী বাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে বিমানঘাঁটি ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনীর ড্রোন সক্ষমতা বিদ্রোহীদের তুলনায় অনেক বেশি।

দীর্ঘদিনের বিরোধের শিকড় কোথায়?

ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই অস্থিতিশীল। ১৯৬২ সালে ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়াকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। এরপর দীর্ঘ স্বাধীনতাসংগ্রাম শুরু হয়। বর্তমান ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ারকির নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে ইরিত্রিয়া।

তবে স্বাধীনতার পরও দুই দেশের বিরোধের অবসান হয়নি। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সীমান্ত নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে দেশ দুটি।

২০১৮ সালে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন। দীর্ঘদিনের বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এমনকি ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় ইরিত্রিয়া তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের (টিপিএলএফ) বিরুদ্ধে ইথিওপিয়া সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইথিওপিয়ার সমুদ্রবন্দরে প্রবেশাধিকার পাওয়ার প্রচেষ্টা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে সংকট তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ বারবার বলেছেন, ইথিওপিয়ার সমুদ্রে প্রবেশাধিকার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে ইরিত্রিয়ার কর্মকর্তারা এসব বক্তব্যকে নিজেদের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।

আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার বর্তমান উত্তেজনা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সমর্থন, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং সীমান্তবর্তী সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

লন্ডনের এসওএএস ইউনিভার্সিটির উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক লরা হ্যামন্ড আলজাজিরাকে বলেন, সংঘাত অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ইতোমধ্যে বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে। তিগ্রে ও অ্যালায়েন্স ফর সারভাইভালকে ইরিত্রিয়ার সমর্থনের অভিযোগ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

তিনি বলেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তিগ্রে অঞ্চলে ইরিত্রিয়ার সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা বাড়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সুদানের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং দেশটির সঙ্গে আঞ্চলিক সম্পর্কেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের বিশ্লেষক মার্টিন প্লটও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার বাস্তব ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন।

আলজাজিরাকে তিনি বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। যেকোনো একটি ছোট ঘটনা বড় ধরনের সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে পারে, যা ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া এবং প্রতিবেশী সুদানকে পর্যন্ত গ্রাস করতে পারে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের পর দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়লে হর্ন অব আফ্রিকার চলমান সংঘাতগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ