সোমবার, ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

একজন মুক্তিযোদ্ধার ভাবনা: র.আ.ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী

২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস; বাংলাদেশের জন্ম দিবস। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশ অনেক ষড়যন্ত্র আর সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। যাদের সবকিছুতেই না-ই না-ই দেখার অভ্যাস, তারা শত সম্ভাবনাও অলীক অন্ধকার ভেবে আজও গলা ফাটায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যাত্রালগ্নে নানা শঙ্কা আর সমূহ পতনের আশঙ্কায় যে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল বলে যারা মুখে ফেনা তুলেছিল, তারা বলতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ বিশ্বের বিস্ময়। পিছিয়ে পড়া দেশ, জাতি, গোষ্ঠীর সামনে রোল মডেল। একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের এই সম্ভাবনা ও অর্জন দেখে যাওয়া অনেক বেশি তৃপ্তির।

যদিও অনেক ক্ষেত্রেই আমরা কাঙ্খিত সফলতা অর্জন করতে পারিনি, বিশেষ করে টেকসই গণতন্ত্র; তবুও বলব নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে সাফল্যের সঙ্গেই বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ পদচারণা করছে। এই সময়ে অনেক দিক থেকে আমাদের অগ্রগতি শুধু সন্তোষজনকই নয়, বিস্ময়করও। আমরা অনেক ধরনের বাধা-বিপত্তি, ষড়যন্ত্র প্রতিমুহূর্তে মোকাবিলা করছি। বারবার দেশের মানুষ এসব অপশক্তি রুখে দিয়েছে। কিন্তু পরাজিত হায়েনারা জাতির জীবনে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তা কখনো ভোলার নয়; বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার কথা বলব। এ কথা আজ হলফ করে বলা যায়, এই পটপরিবর্তন না ঘটলে বাংলাদেশ আকাক্সক্ষার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারত।

’৭১-এর পরাজিত হায়েনার কালো নখের থাবায় সেদিন কক্ষচ্যুত হয়েছিল জাতি। তারা ভেবেছিল, রক্তে কেনা বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনবে পাকিস্তানের ভূতদর্শন এবং সেই লক্ষ্যে তারা অনেকাংশে সফলও হয়েছিল। কিন্তু না, বাংলার মানুষের অজেয় রক্ত পিতার স্বপ্নের সঙ্গে কখনো বেইমানি করতে পারে না। পিতা আমৃত্যু আস্থা রেখেছিলেন বাংলার সাধারণ মানুষের ওপর। আর বাংলার মানুষও নিজেদের সঁপে দিয়েছিলেন পিতার ওপর। পিতা জীবন দিয়ে আস্থার প্রতিদান দিয়ে গেছেন। তাই আজ বাংলার প্রতিটি গণজাগরণের নাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার মাসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত বীরদের। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তদানীন্তন বাংলাদেশের পক্ষে বৈধভাবে কথা বলার একমাত্র ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশবাসী তাকে ভোট দিয়ে নিজেদের শাসন করার, তাদের পক্ষে কথা বলার ক্ষমতা অর্পণ করেছিল। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গৃহীত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’-এ তা এভাবে বিধৃত হয়েছে এবং যেহেতু এরূপ প্রতারণাপূর্ণ ব্যবহারের বাস্তব অবস্থা ও পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ন্যায়সঙ্গত দাবি পূরণের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২৬-শে মার্চ ঢাকায় স্বাধীনতার ঘোষণা দান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।’

বাংলাদেশের যত মহত্তম অর্জন, সবকিছুই মহান স্বাধীনতা কেন্দ্র করে। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের যাত্রাকাল ৫২ পার করে সুন্দর আগামীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মানবসভ্যতার রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাস বিবেচনায় নিলে হয়তো এ সময় খুবই কম। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রজন্ম ইতিহাস তাবৎ পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য। এ অনন্যতা ও বাস্তবতা মাথায় রেখেই বলছি, জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আমাদের চলার পথ কখনো মসৃণ ছিল না। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে বাংলাদেশ নিজের গতিপথ নিজেই বেছে নিয়েছিল। আর এই গতিপথের একমাত্র নির্ধারক ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো জড়িয়ে আছে। এ তিনটি প্রত্যয়ের সমন্বয়ের নাম বাংলাদেশ। আজকের পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় বাংলাদেশকে নিয়ে অনেকেই ভিন্নভাবে চিন্তা করার কথা বলে। কিন্তু আমরা মনে করি, এটা বাতুলতা মাত্র। কেননা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মধ্যেই প্রকৃত বাংলাদেশ নিহিত। আর বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ভিত্তি মহান মুক্তিযুদ্ধ। ’৭৫-পরবর্তী থেকে আজ পর্যন্ত বহুভাবে চেষ্টা করা হয়েছে এবং এখনো চেষ্টা চলছে বাংলাদেশ থেকে এ নামটি মুছে দেওয়ার। কিন্তু সম্ভব হয়নি। কারণ বাংলাদেশের আরেক নাম তো শেখ মুজিবুর রহমান। তার চিন্তাচেতনা বা আদর্শ থেকে কক্ষচ্যুত হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ আমাদের নেই। ১৯৭১ সালের কথা বিবেচনা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে থাকলে চলবে না। এতে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হবে, ব্যাহত হবে উন্নয়ন। তারা কি পেরেছে? না, পারেনি। বাংলাদেশের মানুষ পুনরায় জেগে উঠেছে। সব ষড়যন্ত্র আর প্রতিক্রিয়াশীলতা রুখে দিয়ে জাতির প্রতিটি সংকটে অভূতপূর্ব সাড়া দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাংলার জনসাধারণ।

জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা ও জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অদম্য, ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশের যে গতিশীল যাত্রা গত কয়েক দশকে অব্যাহত আছে; তা অনেকেরই গাত্রদাহের বিষয়। তারা ইনিয়ে-বিনিয়ে বিশ্ব মোড়লদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে। ভাবখানা এমন যেন তাদের পুরনো মিত্রতা আবার তাদের মসনদে বসিয়ে দেবে। তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সেই পুরনো সিঁড়ি সমরতন্ত্র ও তথাকথিত ধর্মের লেবাস। সেসব অপশক্তির মোড়লদের বলব অলীক স্বপ্নে বিভোর না থেকে বাস্তবতায় নেমে আসুন, মানুষের কাছাকাছি আসুন; কান পেতে শুনুন সাধারণ মানুষ কী চায়, বিশেষ করে তরুণদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করুন। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন মানুষ হিসেবে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে তরুণরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদারতা কিংবা মানবতা বেছে নিলেও তাদের মূল ভিত্তি মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির পিতা। তরুণদের এই আকাক্সক্ষা-জাগরণ কলঙ্কমুক্ত ও ভবিষ্যৎ প্রগতির বাংলাদেশকে চিত্রিত করে। আমাদের নিশ্চয় মনে আছে, কসাইখ্যাত কাদের মোল্লার মামলার রায় কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগ চত্ব¡রে নতুন প্রজন্মের মুক্তবুদ্ধির তরুণ ও যুবকদের এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে তরুণ ও যুবকদের অহিংস শান্তিপূর্ণ দ্রোহের সূচনা হয় শাহবাগ চত্ব¡রে। এরই পথ ধরে এ শান্তিপূর্ণ অহিংস দ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। তরুণ যুবাদের এই দ্রোহে শামিল হতে থাকে দেশের আপামর জনগণ। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে তরুণ প্রাণের মুখে উচ্চারিত ‘জয় বাংলা’ সে গান আমাদের ফিরিয়ে নেয় জাতির পিতার চেতনার কাছে, আদর্শের কাছে। ১৯৭১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিল্প ও বণিক সমিতির সংবর্ধনা সভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন ’জয় বাংলা কেবলমাত্র রাজনৈতিক সে গান নয়। এটা বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের প্রতীক।’ আজ আবার জয় বাংলা ফিরে এসেছে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে। সমরতন্ত্র আর ধর্মান্ধতা পেছনে ফেলে আমরা দাঁড়িয়ে আছি একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। আমাদের সামনে এখন একটি পথ খোলা যে পথে দাঁড়িয়ে আছে তরুণরা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে ধারণ করে তারা যখন উচ্চারণ করে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল থাকবে না, এ দেশের রাজনীতি করতে চাইলে সব দলেরই ভিত্তি হবে মুক্তিযুদ্ধ; তখন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদের স্যালুট জানাই। তাদের এই আকাক্সক্ষায় আনন্দে উদ্বেলিত হই; আনমনে গেয়ে উঠি আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, চিন্তাশীল ব্যক্তিসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছে আহ্বান জানাইÑ আসুন না, তরুণদের দেখানো পথেই পা বাড়াই। ভোট আর জোটের হিসাব রাজনীতিতে থাকবেই। কিন্তু দেশ সবার ওপরে। এই যে রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষ, এসবই তো দেশ আছে বলে; দেশ নেই তো কিছুই নেই। তাই আমাদের শপথ স্পষ্ট সব বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে এগোতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার যে সুযোগ এসেছে, তা হেলায় হারাতে দেওয়া যায় না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উৎখাত করায় আমরা জাতি হিসেবে, রাষ্ট্র হিসেবে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পুনর্গঠনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে, ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মোকাবিলা করতে হবে। নতুন দিনের চেতনা, বিজয়ের চেতনা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এক ও অভিন্ন এবং অবিচ্ছেদ্য।

আমরা আশা করব গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে যে আকাক্সক্ষা তাড়িত হয়ে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম রচনা করেছিল, সে লক্ষ্যে আমরা সহনশীলতার সঙ্গে এগিয়ে যাব। নইলে আমাদের সামনে রয়েছে অন্ধকার ভবিষ্যৎ। আগামীর মানুষের কাছে আমরা আমাদের দায় এড়াতে পারব না। একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের যাত্রাপথের প্রতিটি অলিগলির নাম মুজিব। এই নাম বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে বড় প্রিয়। তার আদর্শ সামনে রেখে এগিয়ে নিতে হবে বাংলাদেশকে। জয় বাংলা।

লেখক : যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংসদ সদস্য এবং সম্পাদক, মত ও পথ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ