সোমবার, ২৬শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,১০ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ঘরের টিন-ছাগল বিক্রি করে নেশার টাকা, অতিষ্ঠ বাবা শেষমেশ ছেলেকে দিলেন পুলিশে

পারভেজ আলম আদেল, স্টাফ রিপোর্টার: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে মাদকের ভয়াল ছোবলে অতিষ্ঠ হয়ে নিজের সন্তানকেই পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন এক অসহায় বাবা।

নেশার টাকা জোগাড় করতে ঘরের টিন খুলে বিক্রি, পরিবারের পালিত ছাগল অল্প দামে বিক্রি এবং টাকা না দিলে বাবা-মাকে ছুরি দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে জিয়াউর রহমান নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত ছেলের অত্যাচার আর সহ্য করতে না পেরে নিজেই পুলিশের সহায়তা নেন তার বাবা মন মিয়া।

ঘটনাটি ঘটেছে সরাইল উপজেলার চুন্টা ইউনিয়নের বড়বল্লা গ্রামে। রোববার (৯ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে বড়বল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বড়বল্লা গ্রামের মন মিয়ার ছোট ছেলে জিয়াউর রহমান দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত বলে পরিবারের অভিযোগ। মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তার আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। নেশার টাকা জোগাড় করতে তিনি পরিবারের সদস্যদের ওপর বিভিন্ন সময় চাপ সৃষ্টি ও ভয়ভীতি দেখাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্ক ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল পরিবারটি।

পরিবারের অভিযোগ, নেশার টাকা সংগ্রহ করতে একপর্যায়ে জিয়াউর রহমান শাবল দিয়ে ঘরের বেড়ার টিন খুলে ফেলেন। পরে সেই টিন বিক্রি করে নেশার টাকা জোগাড় করেন। শুধু তাই নয়, পরিবারের পালিত একটি ছাগল, যার আনুমানিক মূল্য ৮০ হাজার টাকা বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সেটিও মাত্র ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, নেশার টাকা না পেলে জিয়াউর রহমান বাবা-মাকে ছুরি-চাকু দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন। টাকা-পয়সার জন্য চাপ সৃষ্টি এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এমন আচরণে পরিবারের সবাই দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন।

মন মিয়ার পরিবারে পাঁচ ছেলে ও চার মেয়ে। পরিবারের ছোট ছেলের এমন আচরণে পুরো পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে বলে স্বজনরা জানান। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা করেও কোনো সুফল না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন বাবা।

রোববার দুপুর ২টার দিকে মন মিয়া নিজেই ছেলে জিয়াউর রহমানকে পুলিশের কাছে তুলে দেন। বড়বল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটলে বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, মাদকের ভয়াবহতা কীভাবে একটি পরিবারকে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে, এ ঘটনা তারই একটি নির্মম উদাহরণ।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জিয়াউর রহমানকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে নেওয়া হলে তাকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, মাদকাসক্তির কারণে কোনো ব্যক্তি নিজের পরিবার কিংবা সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাদক নির্মূলে সরাইল থানা পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পরিবার ও সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

সচেতন মহলের মতে, মাদক শুধু একজন মানুষের জীবনই ধ্বংস করে না, এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। একজন তরুণ মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে পরিবারকে আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। তাই মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি পরিবার, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও সমাজের সচেতন মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

তাদের মতে, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি মাদকের সরবরাহ বন্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা জরুরি। যেন কোনো বাবাকে আর নিজের সন্তানকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার মতো হৃদয়বিদারক সিদ্ধান্ত নিতে না হয়—এ জন্য মাদকের বিরুদ্ধে এখনই সামাজিকভাবে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

, বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ