সোমবার, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল বুমেরাং: রাশিয়া, ইরানের দিকে ঝুঁকছে এশিয়ার অনেক দেশ

যায়যায়কাল ডেস্ক: ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইন রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হচ্ছে।

গত বছর পর্যন্তও এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও কৌশলগত সহযোগী দেশগুলো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মেনে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা এড়িয়ে চলত। জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ আরেক দেশ ইরানের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ ছিল খুব সামান্য।

তবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এই পুরো দৃশ্যটাই বদলে দিয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাবে তেলের বাজারে যে ধাক্কা লেগেছে, তাতে এশিয়ার অনেক দেশের নাজেহাল অবস্থা। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে মস্কো ও তেহরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক বা একটু কথা বলাই এখন তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত সোমবার দক্ষিণ কোরিয়ার একজন বিশেষ দূত পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া জাহাজগুলোর বিষয়ে আলোচনা করতে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।

একই দিন তেল কিনতে মস্কো পৌঁছান ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশরই গন্তব্য ছিল এশিয়া।

যুদ্ধের কারণে হঠাৎ তেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফিলিপাইনের মতো তেলের কম মজুত রাখা দেশগুলো এখন সরবরাহ বাড়ানোর বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হিমশিম খাচ্ছে।

যুদ্ধ কত দিন চলবে, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অস্পষ্ট বার্তার কারণে এশিয়ার অনেক নেতা এখন নিজেদের দেশের তেলের চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের দিকে ঝুঁকছেন।

এর মানে দাঁড়াল, এশিয়ার বেশ কিছু দেশ কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরান ও রাশিয়ার তেল কিনছে। ওয়াশিংটন বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট নিরসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় এটা সম্ভব হচ্ছে।

গত মাসে ফিলিপাইন পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের প্রথম চালান হাতে পেয়েছে।

সাত বছরের বিরতি শেষে চলতি সপ্তাহে ভারতেও আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের অপরিশোধিত তেল পৌঁছেছে।

এই লেনদেন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের কোনো ইঙ্গিত না দিলেও আদতে তা আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বীদেরই সহায়তা করছে।

চিন্তন প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এশিয়া প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর হুয়ং লে থু বলেন, ‘ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি অনেক দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বলয় থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে।’ যদিও এই পরিস্থিতিতে ইরান ও রাশিয়া থেকে এশিয়ায় কী পরিমাণ তেল ঢুকতে পারবে, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।

এশিয়ার অনেক দেশের জন্য রূঢ় বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল আমদানির উৎস খুবই সীমিত। এর মধ্যে অন্যতম হলো রাশিয়া।

এই বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট রাশিয়ার নেতা ভ্লাদিমির পুতিনকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও গত সোমবার পুতিনের প্রশংসা করে বলেন, ‘এই অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি (পুতিন) অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছেন।’

‍২০২২ সালে পুতিন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করেন। ওই সময় দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইনসহ এ অঞ্চলে আমেরিকার কিছু মিত্রদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে রুশ তেল আমদানি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে রাশিয়ার তেলের দাম ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল।

তবে তেল-গ্যাস বাণিজ্যের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভোরটেক্সা’র বিশ্লেষক এমা লি বলেন, রুশ তেল এখন বৈশ্বিক বাজারমূল্যের চেয়ে ১০ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমার আশঙ্কা হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম যতই হোক না কেন, দেশগুলোর সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।’

নিজেদের তেলের মজুত ঠিক রাখতে কিছু দেশ এখন কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তা দেখা যাক:

গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং জাতীয় অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পর্ষদের সভা আহ্বান করেন। পরিষদের পক্ষ থেকে রাশিয়া ও ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করা উচিত বলে পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে চীন ও রাশিয়া থেকে ‘যতটা সম্ভব’ ন্যাপথা কেনারও সুপারিশ করা হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর জন্য চলমান সংকট নিরসনে একটি বিকল্প পথ হলো যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের কৌশলগত তেলের মজুত থেকে তেল ছাড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা।

তবে এমা লি বলেন, এসব জায়গা থেকে তেল আনা ব্যয়বহুল। এ ছাড়া এই প্রক্রিয়ায় চালান পৌঁছাতে দুই মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। তিনি বলেন, অন্যদিকে রাশিয়ার একেবারে পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বন্দরগুলো থেকে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তেলের চালান দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছাতে পারে।

গত ৩০ মার্চ দক্ষিণ কোরিয়া কিছু কোম্পানিকে রাশিয়া থেকে ২৭ হাজার ৯০০ টন ন্যাপথা আমদানির অনুমতি দেয়। এটি একটি পরিশোধিত পণ্য, যা পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং জাতীয় অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পর্ষদের সভা আহ্বান করেন। পরিষদের পক্ষ থেকে রাশিয়া ও ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করা উচিত বলে পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে চীন ও রাশিয়া থেকে ‘যতটা সম্ভব’ ন্যাপথা কেনারও সুপারিশ করা হয়।

পর্ষদের সদস্য পার্ক ওন-জু মনে করিয়ে দেন, ১৯৭৩ সালে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সময় আমেরিকার মিত্র হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়া আরব দেশগুলোর সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছিল। সভায় তিনি আরও বলেন, ‘জোটের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই আমাদের উচিত জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনে কিছু বাস্তবসম্মত বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা। ’

জাপান বর্তমানে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র আর ইরান—উভয়ের সঙ্গেই দেশটির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশই কয়েক দশক ধরে জাপানের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী ছিল।

২০১৫ সালে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার লক্ষ্যে হওয়া চুক্তির আলোচনায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জাপান। ওই সিদ্ধান্তের ফলে তেহরানের সঙ্গে একটি স্বতন্ত্র নীতি অনুসরণের সুযোগ পায় টোকিও।

জাপান সরকারের এক বিবৃতি অনুযায়ী, চলতি মাসে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তিনি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং ইরানি কর্তৃপক্ষের হাতে আটক এক জাপানি নাগরিককে মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে চাপ দেন।

ইরানের সঙ্গে জাপানের সরাসরি যোগাযোগের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০১৯ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে তেহরান সফর করেছিলেন। প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসার এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার নেতিবাচক প্রভাব সামাল দিতেই তিনি ওই সফর করেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ রেখেছিল জাপান। জাপান সরকারের কিছু কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক মনে করছেন, তাকাইচির উচিত ওই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাপ দেওয়া।

এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরোনো মিত্র ফিলিপাইন। দেশটিতে তেলের ঘাটতি এতটাই প্রকট হয়েছে যে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। দেশটি এখন রাশিয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ভারতের দিকে তাকিয়ে আছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ফিলিপাইনের রাষ্ট্রদূত হোসে ম্যানুয়েল রোমুয়ালদেজ বলেন, তাঁর দেশ মার্কিন সরকারের কাছে রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানাচ্ছে, যাতে তারা আরও রুশ তেল কিনতে পারে।

রোমুয়ালদেজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা ‘পরস্পরবিরোধী বিষয়’ নয়। তিনি জানান, তাঁর দেশের পররাষ্ট্রনীতি সব সময়ই ‘নিজেদের জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে’ পরিচালিত হবে।

এক ই–মেইল বার্তায় রোমুয়ালদেজ লিখেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন দেখছে না ফিলিপাইন। এমনকি দেশটি তার আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলোকে কোনো ধরাবাঁধা বা নির্দিষ্ট ছকেও বিচার করে না।’

ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র না হলেও এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিকল্পনার এক অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। কিছুটা ওঠানামা করলেও উভয় পক্ষের জন্যই এই সম্পর্ক রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে ২০১৯ সালেই ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দেয় ভারত। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটনকে খুশি করতে ও একটি বাণিজ্যচুক্তি নিশ্চিতে দেশটি রাশিয়ার তেলের বদলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানির সব প্রস্তুতিও সেরে ফেলেছিল।

কিন্তু ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর জেরে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। এর বদলে ভারতকে আবারও সমুদ্রপথে রুশ তেল আমদানি শুরু করতে হয়েছে। তবে এবার গুনতে হচ্ছে বাড়তি দাম।

ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ইরান থেকে তেল নিয়ে দুটি ট্যাংকার ভারতের বন্দরে ভিড়েছে।

ইন্দোনেশিয়া নিজেদের স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণকারী একটি দেশ হিসেবে দাবি করে। দেশটির সঙ্গে আমেরিকার আনুষ্ঠানিক মিত্রতা চুক্তি নেই। তবে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। গত সোমবার দুই দেশ একটি প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের ঘোষণা দিয়েছে।

একই সময়ে ইন্দোনেশিয়া রাশিয়া থেকে তেল, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা লাওদে সুলাইমান। তিনি জানান, আমদানির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে এখনো আলোচনা চলছে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ