
এস.এম পারভেজ আলম আদেল: সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারি কাজের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। কোথাও সড়ক নির্মাণের কিছুদিন পরই উঠে যাচ্ছে পিচ, কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ত্রুটি, আবার কোথাও ভবন নির্মাণে দেখা যাচ্ছে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ।
এই ক্রমবর্ধমান অনিয়মের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ঠিকাদারি কাজ ‘বিক্রি’ বা সাব-কন্ট্রাক্টে হস্তান্তরের প্রবণতা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের বরাদ্দ পেলেও বাস্তবে সেই প্রতিষ্ঠান নিজেরা কাজ সম্পন্ন না করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাজটি দ্বিতীয় বা তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেয়। এতে করে মূল ঠিকাদার নির্দিষ্ট অঙ্কের লাভ নিশ্চিত করে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায়, আর প্রকৃত কাজটি সম্পন্ন করে এমন কেউ, যার সাথে সরকারি চুক্তির সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রক্রিয়ার কারণে কাজের ব্যয় কাঠামো মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। কারণ, যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কাজটি ক্রয় করে, তাকে প্রথমে মূল ঠিকাদারকে একটি নির্দিষ্ট লাভ দিতে হয়। ফলে সরকারি নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে থেকে কাজের প্রকৃত খরচ কমিয়ে আনতে বাধ্য হয় তারা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নির্মাণ সামগ্রীর মান ও কাজের গুণগত মানের ওপর।
একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, “আমরা যখন কাজের মান খারাপ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করতে যাই, তখন প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায় না। মূল ঠিকাদার বলেন তিনি কাজটি অন্যকে দিয়েছেন, আর যিনি কাজ করছেন তিনি বলেন তিনি শুধু কাজ করছেন, দায় তার নয়।” ফলে অভিযোগ প্রক্রিয়াটিও হয়ে পড়ে জটিল ও অকার্যকর।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই ধরণের অনিয়ম শুধু সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, বরং জনদুর্ভোগও বাড়িয়ে দিচ্ছে। একটি সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণের উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘস্থায়ী সুবিধা নিশ্চিত করা, কিন্তু নিম্নমানের কাজের কারণে তা অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়, ফলে পুনরায় মেরামতের প্রয়োজন হয় এবং সরকারি ব্যয় বেড়ে যায় বহুগুণে।
এ বিষয়ে সরাইল উপজেলা এলজিইডি (LGED) অফিসের এক দায়িত্বশীল প্রকৌশলী বলেন, সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত কোনো কাজ সম্পূর্ণভাবে অন্য ঠিকাদার বা ব্যক্তির কাছে বিক্রি করার কোনো বিধান নেই। তবে কাজের কোনো নির্দিষ্ট অংশ প্রয়োজনে অন্য কাউকে দিয়ে করানো যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে এটি একটি অস্বাস্থ্যকর ট্রেন্ড হিসেবে গড়ে উঠেছে—অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, লাইসেন্সধারী ঠিকাদার পুরো কাজটাই বিক্রি করে দেন এবং অন্যের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করান। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের অবশ্যই বের হয়ে আসতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠিকাদারি কাজের মান নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই এই ‘কাজ বিক্রি’ সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান সরকারি নিয়মে কাজ পাবে, তাদেরকেই সরাসরি কাজ সম্পন্ন করতে বাধ্য করতে হবে। পাশাপাশি কাজের প্রতিটি ধাপে তদারকি জোরদার করা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
তারা আরও বলেন, কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে এবং কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব।
উন্নয়ন প্রকল্পে টেকসই মান নিশ্চিত করতে হলে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সঠিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।











