
যায়যায়কাল প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ক্রিকেটের পথচলায় রোমাঞ্চকর মুহূর্ত ও ঐতিহাসিক জয়ের কমতি নেই। তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেওয়া যেন ছাপিয়ে গেল আগের সব অর্জনকে। যেকোনো ফরম্যাট বিবেচনায় এটিকেই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও স্মরণীয় সাফল্য বলে মনে করছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম বড় অঘটন—এমনটা বলাই যায়। তবে অস্ট্রেলিয়ার খারাপ খেলার চেয়ে বাংলাদেশের অসাধারণ পারফরম্যান্সই এই জয়কে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দলের বিপক্ষে চার দিন ধরে দাপট দেখিয়ে খেলেছে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের এই অসাধারণ জয়কে শুধু ‘অঘটন’ শব্দে সীমাবদ্ধ করা কঠিন।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো কতটা কঠিন, সেটি বোঝা যায় ইতিহাসের দিকে তাকালেই। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এখনো টেস্টে জয় পায়নি শ্রীলঙ্কা। পাকিস্তানের সর্বশেষ জয়ও এসেছিল বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পাঁচ বছর আগের সময়ে। সেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই বাংলাদেশ পেল প্রথম টেস্ট জয়।
তার ওপর নাহিদ রানা ও শরীফুল ইসলামকে ছাড়াই এই ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। ভাবা যায়!
টেস্টে বড় দল হয়ে উঠতে যে আত্মবিশ্বাস ও জয়ের মানসিকতা প্রয়োজন, সেটিরও প্রমাণ দিয়েছে বাংলাদেশ। চতুর্থ দিনের প্রথম সেশন শেষে মেহেদী হাসান মিরাজ জানিয়েছিলেন, জয় পাওয়ার ভাবনাটা তারা অনুশীলন থেকেই তৈরি করেছিলেন। মাঠে সেটির বাস্তবায়নও করেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা।
বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা দেখে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ওপেনার মার্ক ওয়াহও আগেভাগেই অস্ট্রেলিয়ার পরাজয় নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্যাট কামিন্সদের দল বাংলাদেশকে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য দিতে পারে। মার্ক ওয়াহর মতে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটিই অন্যতম বড় অঘটন।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় দ্বিতীয়বারের মতো দ্বিপাক্ষিক টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশ। বিপরীতে অস্ট্রেলিয়া মাঠে নেমেছিল পূর্ণশক্তির দল নিয়ে। টেস্ট র্যাঙ্কিং ও চলমান আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলেও তারা ছিল শীর্ষে। এমন একটি শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ কতটা লড়াই করতে পারবে, তা নিয়ে ছিল যথেষ্ট সংশয়।
কিন্তু সব হিসাব-নিকাশ এলোমেলো করে দিয়েছে বাংলাদেশ দল।
ডারউইনে রোববার চতুর্থ দিনের দ্বিতীয় সেশনে ৯ উইকেটের বিশাল জয় পায় বাংলাদেশ। এই জয়ের ফলে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ অধিনায়ক শান্তর কণ্ঠে ছিল গর্ব ও আত্মবিশ্বাস। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাওয়া এই ঐতিহাসিক টেস্ট জয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের আগের সব সাফল্যকে ছাড়িয়ে গেছে।
শান্ত বলেন, “যেকোনো ফরম্যাট মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি এখন পর্যন্ত আমাদের সবচেয়ে বড় জয়। আমরা বিশ্বাস করি, সামনেও আমরা নতুন কিছু করে দেখাতে পারব।”
এই ম্যাচে বাংলাদেশের দলীয় পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। পেস আক্রমণের দাপট থেকে শুরু করে টপ অর্ডার ও লোয়ার অর্ডারের দায়িত্বশীল ব্যাটিং—সব বিভাগেই অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রেখেছে বাংলাদেশ। ফলে এটি কোনো আকস্মিক বা অলৌকিক জয় নয়; বরং পুরো ম্যাচজুড়ে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফল।
অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদেরই চেনা কন্ডিশনে বাংলাদেশ যেভাবে আধিপত্য বিস্তার করে জয় পেয়েছে, দেশের ক্রিকেটে এমন দৃশ্য আগে খুব কমই দেখা গেছে। তাই শান্তর সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগও খুব কম।
নিজের এবং দলের পারফরম্যান্স নিয়ে গর্বিত বাংলাদেশ অধিনায়ক। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, “সত্যি খুব আনন্দ লাগছে। নিজেকে নিয়ে এবং পুরো দলের পারফরম্যান্স নিয়ে ভীষণ গর্ব হচ্ছে। আমরা অনেক কষ্ট করেছি। আর এ ধরনের একটা জয় পেয়ে সত্যি অনেক ভালো লাগছে।”
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এই জয় শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের জয় নয়; এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাস, সামর্থ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনারও বড় বার্তা। বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার পথে এই জয় বাংলাদেশকে নতুন অনুপ্রেরণা দেবে।











