শুক্রবার, ১৩ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,২৮শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের সেকেন্ড ইন কমান্ড ‘গলা কাটা মোবারক’ গ্রেপ্তার

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: কারাগারে থাকা ডেভিড ইমনের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিত ‘দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী’ মোবারক হোসেন। কিছুদিন ধরে বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়েও মোবারক ওরফে ‘গলা কাটা মোবারককে’ গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

বুধবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের একটি বাড়িতে মোবারকের অবস্থানের খবর পেয়ে পুলিশ তাই সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটি ঘিরে ফেলে। বাড়ির লোহার দরজা ভেঙে ভেতরের একটি ওয়াশরুমে প্রবেশ করতেই ফলস ছাদ থেকে পুলিশের ওপর গুলি চালাতে থাকেন মোবারক। পরপর ছয়টি গুলি করেন তিনি।

এতে আহত হন চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য। কিন্তু এক পর্যায়ে মোবারকের গুলি আটকে যায়, তখনই পুলিশ তাঁকে নামিয়ে এনে গ্রেপ্তার করে।

বুধবার সকালে লেলাং ইউনিয়নের ওই বাড়ি থেকে মোবারকের তিন সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তারা হলেন মো. রায়হান, মো. ফরিদ ও মো. নাছির। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩টি পিস্তল এবং পিস্তলের ২৩টি ও শটগানের ৪টি গুলি।

অভিযানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ ছাড়াও ফটিকছড়ি থানার ওসি রবিউল আলম খান, তারেক আজিজের দেহরক্ষী পুলিশ কনস্টেবল মামুনুর রশিদ, ফটিকছড়ি থানার কনস্টেবল শাহ নেওয়াজ ও সাদ্দাম হোসেন আহত হন। তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মাসুদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, মোবারক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। পাহাড়ের দুর্গম এলাকাকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতেন। এ কারণে পুলিশ সহজে তাকে ধরতে পারত না। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ খবর পেয়ে মোবারককে তার চার সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে। রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন তিনি।

যেভাবে গ্রেপ্তার মোবারক

সন্ত্রাসী মোবারককে গ্রেপ্তারের অভিযানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ।

অভিযানের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, গত ২৯ জুলাই ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায় মোবারক ফটিকছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রয়েছেন। এ জন্য সেখানে পুলিশ কয়েক দফায় অভিযান চালায়; কিন্তু তাকে ধরা যায়নি। সর্বশেষ গত সোমবার ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মোবারকের সহযোগী মো. আরাফাত, মো. মুন্না, ইকবাল ও বাবুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিজেকে পাহাড়ে নিরাপদ মনে না করে মোবারক ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় তার পূর্বপরিচিত একটি বাসায় অবস্থান নেন।

তারেক আজিজ আরও বলেন, বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর মোবারক যে বাসায় অবস্থান নিয়েছিলেন সেখানে গত মঙ্গলবার রাত তিনটার দিকে পুলিশ বাসাটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। কিন্তু বাসার দরজা ছিল লোহার তৈরি। বারবার পুলিশ বলার পরও দরজা খোলা হয়নি। গত ২৯ জুলাই নোয়াখালীতে সন্ত্রাসী রায়হানকে ধরতে পুলিশ যাওয়ার পর তিনি বাসার ছাদ টপকে পালিয়ে যান। বাসাটির ছাদ থেকে লাফিয়ে রায়হানের মতো মোবারকও পালাতে পারেন, সে জন্য পুলিশ সদস্যরা দেয়াল টপকে বাসার ছাদেও অবস্থান নেন। দেড় ঘণ্টা পুলিশ সদস্যরা ডাকাডাকির পরও দরজা না খোলায় স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে লোহার দরজাটি ভাঙা হয়। তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে চারটা।

পুলিশ বাসাটিতে ঢোকার পর ওয়াশরুমের ওপরে থাকা ফলস ছাদে মোবারকের সহযোগী রায়হানকে পাওয়া যায়। তাকে সেখান থেকে ধরা হয়। এভাবে ফলস ছাদের ভেতর থেকে নাছির ও ফরিদকে ধরা হয়। সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ভেতর থেকে গুলি করতে পারে, সে জন্য সতর্কতার সঙ্গে অভিযান দলটি এগোয়। একপর্যায়ে বাসার ভেতরের কক্ষের একটি ওয়াশরুমের ফলস ছাদের ওপর মোবারককে পাওয়া যায়। পুলিশ ওই কক্ষে ঢুকতেই মোবারক তার হাতে থাকা ব্রাজিলের তৈরি তরাস পিস্তল থেকে গুলি করতে থাকেন। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। একে একে ছয়টি গুলি করেন মোবারক। পুলিশ গুলি করে মোট সাতটি। একটি গুলি তারেক আজিজের কানের পাশ দিয়ে যায়। মোবারক সপ্তম গুলিটি করার সময় আটকে যায়। পরে তাকে ফলস ছাদ থেকে নামিয়ে আনা হয়। তার হাতে থাকা পিস্তলটি উদ্ধার করে পুলিশ।

এটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র। তারেক আজিজ আরও বলেন, মোবারককে গ্রেপ্তারের পর ফটিকছড়ি ও রাউজানে অস্ত্র উদ্ধারে বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত অভিযান চালানো হয়।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, গ্রেপ্তারের পর অস্ত্র লুট ও পুলিশের ওপর হামলা—এ দুই মামলায় আদালতে মোবারকের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত চার দিন করে মোট আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিকে মোবারককে গ্রেপ্তারে ফটিকছড়ি, রাউজান ও নগরে স্বস্তি ফিরে এসেছে। চাঁদা না পেয়ে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের ব্যবসায়ী মো. আবছার উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে গত ১৪ মে মোবারক তার সহযোগীদের নিয়ে গুলি করেন। এর পর থেকে ভয়ে এলাকাছাড়া তিনি।

জানতে চাইলে আবছার উদ্দীন বলেন, লোকজন মোবারকের ভয়ে আতঙ্কে থাকতেন। এই আসামি আবার যেন বেরিয়ে আসতে না পারে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

, বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ