মঙ্গলবার, ২১শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,৬ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

বাংলাদেশের অর্থনীতির গভীর সংকটের চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে

যায়যায়কাল ডেস্ক: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও মূলধন–ঘাটতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কমছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা।

অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সার-সহায়তায় সরকার বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেও এর উল্লেখযোগ্য অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায় না। অনেক সচ্ছল পরিবার সুবিধা পেলেও দরিদ্রতম বহু পরিবার সামাজিক সুরক্ষার বাইরে থেকে যায়।

বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে অর্থনীতির এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি মঙ্গলবার প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফেরানো, জ্বালানিনিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কর-রাজস্ব বাড়ানোকে সংস্কারের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের দুই অর্থবছরে তা কমে যথাক্রমে ৪ দশমিক ২ ও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়।

গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২ দশমিক ২ শতাংশে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে এটিই সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি।

প্রবৃদ্ধি কমার বড় কারণ বিনিয়োগের সংকোচন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৫ এবং সরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নও ঐতিহাসিকভাবে নিচু পর্যায়ে নেমেছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প পর্যালোচনা, নতুন প্রকল্প অনুমোদনে সতর্কতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতায় উন্নয়ন ব্যয় কমেছে।

শিল্প ও কর্মসংস্থানে চাপ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে শিল্প খাতের এটি প্রথম সংকোচন।

গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বা কর্মী ছাঁটাই করেছে।

বাংলাদেশ ২০১৭ সাল পর্যন্ত গ্যাসে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। এখন মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হচ্ছে। কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র ও মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে কোনো একটি স্থাপনায় সমস্যা হলেই বড় এলাকায় সরবরাহ কমে যায়।

অর্থনীতির ধীরগতির প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারেও। শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারানো নারীদের অনেকে শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। তবে ২০২৫ সালের পর নতুন শ্রমশক্তি জরিপ না থাকায় সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন।

মূল্যস্ফীতি কমলেও চাপ বেশি

গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে গত অর্থবছরে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। গত আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা এবং মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উঁচু পর্যায়ে রেখেছে। খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। কম আয়ের শ্রমিকদের মজুরিও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল রাখতে পারেনি। আগস্টে তাদের প্রকৃত মজুরি আবার ঋণাত্মক হয়ে যায়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণ, ভর্তুকি ও সুদসহ চলতি ব্যয়, প্রবাসী আয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনায় অর্থ সরবরাহ বেড়েছে। কিন্তু বেসরকারি ঋণ ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়েনি। ফলে অর্থ সরবরাহের প্রবৃদ্ধি উৎপাদনের চেয়ে দামের ওপর বেশি চাপ তৈরি করতে পারে।

দারিদ্র্য বেড়েছে

বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমায় দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে এই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে।

জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।

ব্যাংক খাতে বড় ঝুঁকি

ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকিগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামি ব্যাংকগুলোয় এই হার ৫৮ দশমিক ৯ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ।

ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। অথচ ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক হার ১০ শতাংশ।

প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়ম শিথিল করায় ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ প্রভিশন রাখতে হয়নি। এতে ব্যাংকের প্রকৃত দুর্বলতা পুরোপুরি প্রকাশ পাচ্ছে না।

দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জামানতবিহীন তারল্য সহায়তা ২০২৬ সালের জুনে ৭৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ছয়টি ইসলামি ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা শেষ হলেও অন্য ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর।

ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন ও আমানত সুরক্ষা আইন পাস করাকে ইতিবাচক বলেছে বিশ্বব্যাংক। তবে দুর্বল ব্যাংককে বারবার ছাড় ও তারল্য সহায়তা দেওয়ায় প্রকৃত লোকসান শনাক্ত ও সমাধানের প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে।

বেসরকারি ঋণ ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩০ জুলাই নীতি সুদ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। ছয় বছরের মধ্যে এটিই প্রথম নীতি সুদ হ্রাস।

তবে ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রবৃদ্ধি জুনে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ।

গত ২৯ জুন ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা অর্থায়ন ছাড়া অন্য ঋণে আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এভাবে সুদের ব্যবধান বেঁধে দিলে ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসার ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে। ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বড় প্রতিষ্ঠান বা সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হতে পারে। এতে ব্যাংকের মুনাফা ও মূলধন পুনর্গঠনের সক্ষমতাও কমতে পারে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ