
যায়যায়কাল ডেস্ক: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ফের বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে। বুধবার দুই দেশের মধ্যে জুলাইয়ের পর সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও মিত্রদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ হামলার পর ইরানের পাল্টা হামলাকে ‘লাভ ট্যাপ’ বা ‘ভালোবাসার হালকা ছোঁয়া’ বলে মন্তব্য করেছেন।
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর ‘খুব কঠোর’ হামলা চালিয়েছে এবং প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় আবারও হামলা চালাতে প্রস্তুত।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “গত রাতে এটি ছিল খুবই বড় হামলা। আমরা যখন চাই তখনই আবারও এমন হামলা চালাতে প্রস্তুত।”
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত এবং ইরানের ওপর মার্কিন হামলা ছিল অত্যন্ত কঠোর। অন্যদিকে ইরানের পাল্টা আঘাতকে তিনি তুলনামূলকভাবে ‘লাভ ট্যাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলা
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অভিযানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-সংশ্লিষ্ট বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপনের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ওই অঞ্চলে মার্কিন ও বাণিজ্যিক নৌযানের জন্য হুমকি তৈরি করছিল।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের দুটি সরকারি মালিকানাধীন তেলবাহী জাহাজেও হামলা চালিয়েছে। সামগ্রিক অভিযানে প্রায় ১০০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তারা।
ইরানের পাল্টা হামলা
মার্কিন হামলার জবাবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান ও মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। জর্ডান জানিয়েছে, তারা ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। বাহরাইনও ইরানি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে।
ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মার্কিন মিত্র দেশও সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ফলে সংঘাতটি শুধু ওয়াশিংটন-তেহরান দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার অভিযোগ
এদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক এলাকার কুহেস্তাকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলা হয়েছে। ইরানের দাবি, ওই ঘটনায় কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৬০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা অন্তত চারজন বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ঘটনাটি পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে; তবে হামলায় বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল কি না, তা যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেনি।
২০২৭ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা?
সংঘাতের মাত্রা বাড়ার মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত কিছু মার্কিন সেনার মোতায়াদ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে। কিছু সেনা ও সামরিক ইউনিটের অবস্থান ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট মোতায়েন রয়েছে। এই উপস্থিতির মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কূটনৈতিক চাপ, সীমিত সামরিক অভিযান কিংবা আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ—বিভিন্ন বিকল্প খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা দীর্ঘমেয়াদি এই অভিযান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক নেতাদের একটি মূল্যায়নে দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অভিযান চালালে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।
‘যুদ্ধ বেশিদিন চলবে না’—ট্রাম্প
একদিকে আবারও হামলার হুমকি দিলেও ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ‘আর খুব বেশি দিন’ স্থায়ী হবে বলে তিনি মনে করেন না। তবে একই সময়ে তিনি প্রয়োজন হলে ইরানে আরও হামলা চালানোর প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন।
এদিকে নতুন করে সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ও বিশ্ববাজারে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলে সংঘাতটি আরও বিস্তৃত হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ ও সামরিক গোষ্ঠীগুলোকেও সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে।











