
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: হিমালয়ের বুক চিরে নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত নেপাল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার প্রলয়ংকরী পানির স্রোতে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোতে কোশি নদী ও এর আশপাশের এলাকায়। পরে বন্যার স্রোত ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদী অববাহিকা ধরে আরও দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এলাকায় ৩৩ দেশের মোট ৬৪৪ জন পর্যটক ও ভ্রমণকারী যোগাযোগবিচ্ছিন্ন বা নিখোঁজ ছিলেন। এর মধ্যে ১২৭ জন নেপালি এবং ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক।
নেপাল পুলিশের ফেসবুক পেইজে ৬৪৪ জন নিখোঁজ থাকার একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। দেশভিত্তিক যে পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে, তা হলো—
ভারত ১৭৮ জন, নেপাল ১২৭, যুক্তরাষ্ট্র ৬৫, ইউক্রেন ৫৩, মালয়েশিয়া ৫১, অস্ট্রেলিয়া ৩৫, যুক্তরাজ্য ৩৩, কানাডা ২৫, সিঙ্গাপুর ৯, জার্মানি ৮, রাশিয়া ৮, লাটভিয়া ৬, দক্ষিণ আফ্রিকা ৬, জাপান ৫, নিউজিল্যান্ড ৫, ফ্রান্স ৪, বেলজিয়াম ৩, স্পেন ৩, আয়ারল্যান্ড ২, ইতালি ২, কাজাখস্তান ২, নেদারল্যান্ডস ২, পর্তুগাল ২। অন্যান্য কয়েকটি দেশ ১ জন করে নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপালের পর্যটন বোর্ডের ওই সময়কার হিসাবেও ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও কানাডার নাগরিকও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ছিলেন।
তবে ৬৪৪-ই মোট নিখোঁজ নয়
এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। ৬৪৪ জনের তালিকাটি মূলত পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের নিয়ে। এর বাইরে স্থানীয় বাসিন্দা, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সরকারি কর্মচারীসহ আরও বহু মানুষ নিখোঁজ ছিলেন।
বৃহস্পতিবার নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে নেপালে মোট ৯১০ জন মানুষ নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকার কথা জানানো হয়। তাদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও ছিলেন।
প্রাণহানি ৩৮৯, আহত শত শত
বৃহস্পতিবার রাতের সর্বশেষ নেপালি পুলিশ-ভিত্তিক আপডেটে বন্যায় ৩৮৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। আটটি জেলায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চিতওয়ানে ১৩৭, পূর্ব নওয়ালপরাসিতে ৮৭, ধাদিংয়ে ৩৩, গোরখায় ৩২, নুয়াকোটে ২৮, তানাহুনে ২৮, পশ্চিম নওয়ালপরাসিতে ২৭ এবং রাসুয়ায় ১৭টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে। একই সময়ে ৪৬৬ জন আহত বা উদ্ধার হয়েছেন।
চলমান উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। রাসুয়ার দুর্গম এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার এক পর্যায়ে ৩৩৬ জনকে আকাশপথে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়, যাদের মধ্যে ছয় দেশের ৪৫ জন বিদেশি নাগরিক ছিলেন।
কীভাবে শুরু হলো এই মহাপ্রলয়?
প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্প হয়তো বন্যার সূত্রপাত ঘটিয়েছে। কিন্তু স্যাটেলাইট ছবি ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এখন বরফ-শিলা ধস বা ice-rock avalanche-এর সম্ভাবনাই সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে।
নেপালের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সীমান্তের কাছে একটি বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ নদীর গতিপথ আটকে দেয়। সেখানে অস্থায়ী জলাধার বা debris lake তৈরি হয়ে পরে হঠাৎ ভেঙে পড়লে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা, বরফ ও পাথর নিচের দিকে ধেয়ে আসে। এতে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর পানি অস্বাভাবিক দ্রুত বেড়ে যায়।
প্রযুক্তিগত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আকস্মিক স্রোতের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ঘনমিটার অতিরিক্ত পানি। ভোতে কোশি-ত্রিশূলী-নারায়ণী নদী ব্যবস্থার ওপর দিয়ে এই বিশাল স্রোত নেমে যায়।
সামনে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বিপদ এখনও পুরোপুরি কেটে যায়নি।
নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার উৎসস্থলের কাছে নদীর গতিপথে আবারও পানি জমে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে এবং সেটি ক্রমেই বড় হচ্ছে। এটি হঠাৎ ভেঙে পড়লে ভোতে কোশি নদীতে আরেক দফা আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।
এ কারণে নদীর তীরবর্তী বাসিন্দা, পর্যটক, উদ্ধারকর্মী ও অন্যদের নিরাপদ স্থানে থাকার এবং নদীর তীর থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চীনও সীমান্তের ওপারে নতুন জলাধার ও সম্ভাব্য বন্যার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক দিনে ওই এলাকায় প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে এবং পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভয়াবহ বার্তা
এই দুর্যোগের একটি বড় মানবিক দিক হলো বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীর নিখোঁজ হওয়া। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী উপত্যকা দিয়ে তিব্বতের কৈলাস-মানসসরোবরের পথে যাওয়া বহু পর্যটক ও তীর্থযাত্রী এই দুর্যোগের মধ্যে পড়েছেন।
ভারতীয় নাগরিকরাই সবচেয়ে বেশি নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউক্রেন, মালয়েশিয়া ও কানাডার নাগরিকরাও নিখোঁজ তালিকায় রয়েছেন।
এক নজরে নেপালের বন্যা পরিস্থিতি
বন্যার সময়: ২৬ আগস্ট ২০২৬
প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা: রাসুয়া ও ভোতে কোশি নদী অববাহিকা
মৃত: অন্তত ৩৮৯ জন
নিখোঁজ/যোগাযোগবিচ্ছিন্ন: নেপালে প্রায় ৯১০ জন
পর্যটক ও ভ্রমণকারী নিখোঁজ: ছবির সময়ের হিসাবে ৬৪৪ জন
বিদেশি পর্যটক নিখোঁজ: ৫১৭ জন
নেপালি পর্যটক/ভ্রমণকারী: ১২৭ জন
উদ্ধার/আকাশপথে সরানো: শত শত মানুষ; রাসুয়া থেকে এক পর্যায়ে ৩৩৬ জনকে এয়ারলিফট করা হয়
সম্ভাব্য কারণ: বরফ-শিলা ধস, নদী আটকে অস্থায়ী জলাধার তৈরি ও আকস্মিক ভেঙে পড়া
নতুন ঝুঁকি: উৎসস্থলের কাছে তৈরি নতুন হ্রদ ভেঙে আবারও আকস্মিক বন্যা হতে পারে।
নেপালের এই বিপর্যয় শুধু একটি ভয়াবহ বন্যা নয়; এটি হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তিত পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকিরও একটি বড় সতর্কবার্তা। বরফ ও পাথরের বিশাল ধস, আকস্মিক জলপ্রবাহ এবং দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা মিলে মুহূর্তের মধ্যে একটি বিস্তীর্ণ জনপদকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।
এখনও বহু পরিবার স্বজনের অপেক্ষায়। বহু বিদেশি পর্যটকের ভাগ্য অনিশ্চিত। আর নতুন করে হ্রদ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্ধারকর্মীদেরও প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
নেপালে উদ্ধার অভিযান চলছে—কিন্তু নিখোঁজদের সন্ধান এবং নতুন বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।











