
যায়যায়কাল ডেস্ক: চোখে দৃষ্টিশক্তি নেই। কিন্তু ফুটবল খেলার সময় যেন সবকিছুই দেখতে পান মেক্সিকোর ৩১ বছর বয়সী পাউলিনা ‘পাউ’ হার্নান্দেজ। কালো চোখের মাস্ক পরে সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে নামেন তিনি। চারপাশের শব্দ, সতীর্থদের নির্দেশনা এবং ধাতব বলের ঝনঝন শব্দ অনুসরণ করে এগিয়ে যান বলের দিকে।
মেক্সিকো সিটির চিলাঙ্গাস এফসি দলের খেলোয়াড়রা অনুশীলনের সময় চোখের ওপর কালো মাস্ক পরেন। কারও দৃষ্টিশক্তি আংশিক, আবার কেউ পুরোপুরি দৃষ্টিহীন। কিন্তু মাঠে নামার পর সবাই সমান—কারও চোখে আলো নেই।
পাঁচজন করে দুই দল মাঠে নামে। রেফারির বাঁশির সঙ্গে শুরু হয় খেলা। বলের ভেতরে থাকা ধাতব বস্তু ঝনঝন শব্দ তৈরি করে, আর সেই শব্দ অনুসরণ করেই খেলোয়াড়রা বলের অবস্থান বুঝতে পারেন। সতীর্থরাও একে অন্যকে নির্দেশনা দেন।
মেক্সিকোর নারী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুটবলারদের জন্য এটি শুধু একটি খেলা নয়; বরং আত্মবিশ্বাস, স্বাধীনতা ও সামাজিক বাধা অতিক্রমের নতুন পথ।
ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় চিলাঙ্গাস এফসি
মেক্সিকোতে ফুটবলের জনপ্রিয়তা ব্যাপক। দেশটির প্রায় ১০ জনের মধ্যে ছয়জন নিজেদের ফুটবলপ্রেমী বলে মনে করেন। ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যেও ফুটবলই সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা।
তবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীদের ফুটবলে অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। এই বাস্তবতা বদলানোর উদ্যোগ নেন কোচ ওয়েন্ডি দেল রিও।
এর আগে প্রায় সাত বছর মেক্সিকো সিটির পুরুষ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুটবল দলের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে বারবার নারীরা তার কাছে এসে জানতে চাইতেন—তারা কোথায় ফুটবল খেলতে পারবেন?
কিন্তু তাদের জন্য কোনো দল ছিল না।
দেল রিও বলেন, নারীরা ফুটবল খেলতে চাইলেও তাদের জন্য কোনো জায়গা ছিল না। সেই প্রয়োজন থেকেই ২০২০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন চিলাঙ্গাস এফসি, মেক্সিকোর নারী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুটবলের অন্যতম প্রথম বিশেষায়িত ক্লাব।
করোনাভাইরাস মহামারির কারণে কার্যক্রম শুরুতে বাধাগ্রস্ত হলেও ২০২৩ সালের মধ্যে কয়েকজন খেলোয়াড়কে নিয়ে দলটি গড়ে ওঠে।
বর্তমানে মেক্সিকোতে নারীদের জন্য মাত্র ছয়টি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুটবল দল রয়েছে। এর মধ্যে চিলাঙ্গাস এফসি অন্যতম।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রথমবার মেক্সিকোর নারী দল
এবার ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে চিলাঙ্গাস এফসি।
মেক্সিকোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি নারী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুটবল দল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাচ্ছে। সেপ্টেম্বর মাসে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হবে Women’s Blind Football American Championship, যা কোপা আমেরিকা নামেও পরিচিত।
এই প্রতিযোগিতায় মেক্সিকোর প্রতিনিধিত্ব করবেন চিলাঙ্গাস এফসি-এর খেলোয়াড়রা।
দলটির খেলোয়াড় পাউলিনা হার্নান্দেজও রয়েছেন নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে। তার আশা, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের অংশগ্রহণ মেক্সিকোর আরও অনেক নারীকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা জয় করে খেলাধুলায় আসতে উৎসাহিত করবে।
প্রায় এক শতাব্দীর পুরোনো ব্লাইন্ড ফুটবল
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের ফুটবলের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর। International Blind Sports Federation-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯২০-এর দশকে স্পেনে স্কুল পর্যায়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য এই খেলার সূচনা হয়।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এই খেলাটি জায়গা পেতে বেশ সময় লেগেছে। ১৯৯৬ সালে এটি International Blind Sports Federation-এর অধীনে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
পুরুষদের ব্লাইন্ড ফুটবল দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে থাকলেও নারীদের খেলাটি এখনো বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে। পুরুষদের ব্লাইন্ড ফুটবল ২০০৪ সালে প্যারালিম্পিকসে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু নারীদের ব্লাইন্ড ফুটবল এখনো প্যারালিম্পিকসের অংশ হয়নি।
ফলে নারী ব্লাইন্ড ফুটবলের জন্য অর্থায়ন, অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সুযোগও তুলনামূলকভাবে সীমিত।
নেই নিজস্ব মাঠ, নেই প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন
চিলাঙ্গাস এফসি-এর সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো অবকাঠামোর অভাব।
দলটির নিজস্ব কোনো মাঠ নেই। নেই প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন কিংবা বেতনভুক্ত কর্মী। অনুশীলন ও ম্যাচ আয়োজনের জন্য উপযুক্ত মাঠ খুঁজে পেতেও তাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়।
ব্লাইন্ড ফুটবলের জন্য এমন একটি মাঠ প্রয়োজন, যার চারপাশে দেয়াল বা ঘের থাকে। এতে বল মাঠের বাইরে চলে যায় না এবং দেয়ালে বলের ধাক্কার শব্দ থেকেও খেলোয়াড়রা বলের অবস্থান বুঝতে পারেন।
খেলার সময় দর্শকদেরও নীরব থাকতে হয়। সাধারণত দুই দলের গোলরক্ষকের একজন দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন হতে পারেন এবং তিনি সতীর্থদের নির্দেশনা দেন। মাঠের খেলোয়াড়রাও পরস্পরকে শব্দের মাধ্যমে নির্দেশ দেন।
দৃষ্টি নয়—এই খেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্বাস, যোগাযোগ, শ্রবণশক্তি ও স্মৃতিশক্তি।
‘মাঠে নামলে মনে হয় আমি দেখতে পাচ্ছি’
পাউলিনা হার্নান্দেজ ছোটবেলায় retinitis pigmentosa নামের একটি বিরল চোখের রোগে আক্রান্ত হন। এই রোগে ধীরে ধীরে রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায়।
চার বছর আগে তিনি পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি হারান।
তবে খেলাধুলার প্রতি তার ভালোবাসা কখনো কমেনি। আগে তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য তৈরি গোলবল খেলতেন। কিন্তু গোলবল ইনডোর ভলিবল কোর্টে হাতে খেলা হয়। ছোটবেলায় যে ফুটবল খেলাটিকে ভালোবাসতেন, সেটির বিকল্প সেটি হতে পারেনি।
পরবর্তীতে মেক্সিকান ফেডারেশন অব স্পোর্টস ফর দ্য ব্লাইন্ড অ্যান্ড ভিজ্যুয়ালি ইমপেয়ার্ডের সভাপতি এফ্রাইন মোরা গার্সিয়া তাকে চিলাঙ্গাস এফসি-তে যোগ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন।
দলে যোগ দেওয়ার পর দ্রুতই ফুটবলের প্রতি নতুন করে ভালোবাসা তৈরি হয় হার্নান্দেজের।
তিনি বলেন, “আমি যখন মাঠে থাকি, মনে হয় যেন আমি দেখতে পাচ্ছি। আমি জানি আমার সতীর্থরা কোথায়, বল কোথায়। আমি ভয় পাই না।”
তার মতে, ফুটবল তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও পরিপূর্ণ করেছে।
দৃষ্টিহীনতার চেয়ে বড় বাধা সামাজিক মানসিকতা
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা সবসময় শারীরিক নয়—অনেক সময় সমাজ ও পরিবারের মানসিকতাই বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
মেক্সিকোর ক্রীড়া কর্মকর্তাদের মতে, অনেক পরিবার মেয়েদের শারীরিক সংস্পর্শযুক্ত খেলায় অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করে। আঘাত পাওয়ার ভয় থেকেও তাদের খেলাধুলা থেকে দূরে রাখা হয়।
এর পাশাপাশি নারীদের ওপর ঘরের কাজ ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার দায়িত্বও তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে খেলাধুলার জন্য সময় বের করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
মোরা গার্সিয়া বলেন, “অনেক সময় সবচেয়ে বড় বাধাগুলো শারীরিক নয়। এগুলো সমাজ ও পরিবার তৈরি করে। এই নারীদের শুধু নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ প্রয়োজন।”
ভাঙা রাস্তা ও ভিড়ের শহর পেরিয়ে অনুশীলনে
হার্নান্দেজের জন্য ফুটবল অনুশীলনে পৌঁছানোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সাদা ছড়ি হাতে তাকে প্রতিদিন মেক্সিকো সিটির ব্যস্ত রাস্তা, ভাঙা ফুটপাত ও জনাকীর্ণ বাসের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হয়। অনেক সময় অপরিচিত মানুষ সাহায্য করার উদ্দেশ্যে তার হাত ধরে ফেলেন। কিন্তু তার কাছে এই আচরণ অনেক সময় অস্বস্তিকর ও অনধিকারচর্চার মতো মনে হয়।
তবে হার্নান্দেজ মনে করেন, তার সবচেয়ে বড় বাধা দৃষ্টিহীনতা নয়; বরং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীরা কী করতে পারেন বা পারেন না—এ নিয়ে মানুষের পূর্বধারণা।
তিনি ম্যাসাজ থেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করেন এবং ছয় বছর বয়সী ছেলে নোয়েলকে বড় করছেন।
হার্নান্দেজের ভাষায়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষও অনেক কিছু করতে পারেন। রান্না করা, পরিবারের যত্ন নেওয়া কিংবা সন্তানকে বড় করা—কোনোটিই তাদের জন্য অসম্ভব নয়।
তার বিশ্বাস, ভয়কে জীবনের নিয়ন্ত্রক হতে দেওয়া যাবে না।
“আমরা নিজেদের ছোট একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে রেখে ঘরে বসে থাকতে পারি না। বাইরে বের হয়ে আমরা কী করতে পারি, তা খুঁজে দেখার চেষ্টা না করলে জীবনে কিছুই করা সম্ভব নয়।”
‘এখানে থাকলে মনে হয় একটি পরিবারের সঙ্গে আছি’
চিলাঙ্গাস এফসি-এর ২০ বছর বয়সী খেলোয়াড় আলেক্সান্দ্রা রামিরেজও দলটির মাধ্যমে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছেন।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের একটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা রামিরেজের কাছে ব্লাইন্ড ফুটবল এখন বড় স্বপ্ন।
তিনি বলেন, “এখন ফুটবল আমার জন্য একটি বড় স্বপ্ন। আমি একজন খেলোয়াড় হিসেবে আরও উন্নতি করতে চাই। অনুশীলন, কৌশল ও ভালো সতীর্থ হওয়ার জন্য আমি সবকিছু করছি। এখানে থাকলে মনে হয়, আমি একটি পরিবারের সঙ্গে আছি।”
ছেলের সামনে খেলতে চান পাউলিনা
ব্রাজিলে সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন হার্নান্দেজ ও রামিরেজ।
তবে হার্নান্দেজের কাছে কোপা আমেরিকায় খেলার স্বপ্ন শুধু ফুটবলকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার ছেলের ভালোবাসা ও স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
তিনি বলেন, “আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলোর একটি হলো, আমার ছেলে যেন আমাকে কোপা আমেরিকায় খেলতে দেখে। আমি মাঠ থেকে বের হয়ে আসার পর সে যেন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে—‘অভিনন্দন মা।’”
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে হার্নান্দেজ সাদা ছড়িটি খুলে নেন। পাশে তার ছেলে নোয়েল। এরপর শুরু হয় বাড়ি ফেরার পথ।
পরদিন আবার ব্যস্ত মেক্সিকো সিটির ভিড়, ভাঙা ফুটপাত আর জনাকীর্ণ বাস পেরিয়ে তাকে ছুটতে হবে। কয়েক দিন পর আবার ফিরবেন ফুটবল মাঠে।
যে মাঠে চোখে আলো না থাকলেও তিনি বলেন—সেখানে তিনি যেন সবকিছু দেখতে পান।











