মঙ্গলবার, ২১শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,৬ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

চীনে পরমাণু হামলার হুমকি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র

যায়যায়কাল ডেস্ক: দুই পরাশক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দূরত্ব প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ হলেও চীনের অবস্থান দ্বিতীয়। এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বন্ধুত্ব ঠিক কতটা—তা জানার আগ্রহ অনেকের।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভৌগোলিক আয়তন প্রায় সমান—অর্থাৎ, ৯৫ লাখ বর্গকিলোমিটারের বেশি। তবে ইতিহাসের দিক থেকে চীনের আছে সুদীর্ঘ ৫ হাজার বছরের ঐতিহ্য। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র উদযাপন করছে দেশটির ২৫০ বছর পূর্তি।

গত ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং। চিরায়ত নিয়ম ভেঙে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প নিজেই অতিথিকে বরণ করে সংবাদ শিরোনাম হন।

এই দুই নেতার বৈঠক নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিল যে তাদের ভোজের থালায় কী কী খাবার উঠেছিল তাও সংবাদকর্মীদের দৃষ্টি এড়ায়নি।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক দিয়ে অনলাইনে খোঁজ করতে গিয়ে চোখ আটকে গেল ‘থুসিদিদিস ট্র্যাপ’ বা ‘থুসিদিদিস ফাঁদ’ শব্দগুচ্ছে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়—শি জিনপিং ‘থুসিদিদিস ফাঁদ’ এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যাপক সহায়তা কামনা করছেন।

এতে বলা হয়—এই ‘ফাঁদ’ এড়ানো গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সামরিক সংঘাতও এড়িয়ে চলা সম্ভব। কেননা, ইতোমধ্যে পরাক্রমশালী দেশ দুইটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য ও তাইওয়ান নিয়ে বেশ জটিল পরিস্থিতি পার করছে।

আরও বলা হয়, হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজিত শীর্ষ সম্মেলনে চীনের রাষ্ট্রপতি শি দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ সামরিক সংঘাত এড়াতে ও পারস্পরিক সুবিধা পেতে কিছু শর্ত জুড়ে দেন।

সে বিষয়ে যাওয়ার আগে ‘থুসিদিদিস ফাঁদ’ সম্পর্কে খানিক খোঁজ নিয়ে জানা গেল—এটি একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব। থুসিদিদিস ছিলেন প্রাচীন এথেন্সের একজন ঐতিহাসিক ও সামরিক বাহিনীর জেনারেল। তার জন্ম খুব সম্ভব খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০ সালে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১ সালে শুরু হওয়া গ্রিসের এথেন্স ও স্পার্টা নগররাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ২৭ বছরের যুদ্ধের ঘটনা লিখে থুসিদিদিস ইতিহাসে অমর হয়েছেন। সেই ‘পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধ’ নিয়ে থুসিদিদিসের তত্ত্বটি ‘থুসিদিদিস ফাঁদ’ হিসেবে ইতিহাসে সুপরিচিত।

এই যুদ্ধ নিয়ে বিবিসি প্রযোজিত একটি চলচ্চিত্র আছে। নাম: ‘দ্য ওয়ার দ্যাট নেভার এন্ডস’। আইএমডিবি-র রেটিংয়ে ১০ এর মধ্যে ৭ দশমিক ৭ পেয়েছে চলচ্চিত্রটি।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেল—‘থুসিদিদিস ফাঁদ’ তত্ত্ব দিয়ে বোঝায়, যখন কোনো উদীয়মান শক্তি অন্য দেশের প্রতিষ্ঠিত শাসকে উৎখাত করতে চায় তখন যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে।

এমনকি, এসব যুদ্ধ বহু বছর ধরে চলতে পারে।

আরও জানা যায়—ওয়াশিংটন ও বেইজিং এর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত কমে যাওয়ার তুলনায় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এখন দেখার বিষয় শীর্ষ ক্ষমতাধর দেশ দুটি ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নেয় কি না।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক জানতে গিয়ে আরও জানা গেল—১৭৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি বিশ্বের নতুনতম দেশ যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার দেশ চীনে বাণিজ্য জাহাজ পাঠিয়েছিল। মূলত তখন থেকেই বিশ্বের দুই প্রান্তের দুই দেশের সম্পর্কের ‘গল্প’ শুরু।

চীনে মার্কিন দূতাবাসের ওয়েবসাইটে বলা হয়—১৭ ও ১৮ শতকে মার্কিন ব্যবসায়ীরা চিনামাটির বাসন, চা ও রেশম কিনতে চীনে আসতো। ইউরোপের ধনীরা এসব বিলাসীপণ্য ব্যবহার করতেন। তাই দেখে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা সেসব পণ্যের দিকে ঝুঁকতে থাকেন।

মার্কিন বণিকেরা দুর্যোগপূর্ণ প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে চীনে আসলেও দেশটিতে বাণিজ্য করা খুব সহজ ছিল না জানিয়ে ওয়েবসাইটে আরও বলা হয়—চীনের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী বিদেশিদের বাণিজ্য করতে তেমন সুযোগ দিত না। কেননা, চীনের এক সম্রাট বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর কোনো জায়গা থেকে আমাদের কিছু কেনার প্রয়োজন হয় না।’

প্রথমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিনিরা চীনাদের সঙ্গে বাণিজ্য করলেও পরে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিরোধ বাঁধলে মার্কিন বণিকরা আলাদাভাবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা চালাতে শুরু করে।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের হাডসন ও চীনের হোয়াংহো দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে যায়। ইউরোপে অল্প সময়ের মধ্যে দুটি মহাযুদ্ধ হয়। সেসব যুদ্ধে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনও জড়িয়ে পড়ে।

মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন নতুন মোড় আসে।

একনজরে সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ‘অম্ল-মধুর’ সম্পর্ক।

যুক্তরাষ্ট্র-গণচীনের টানাপড়েন

গত ৭৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও গণচীনের সম্পর্ক বেশ চড়াই-উৎরাইয়ে ভেতর দিয়ে চলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দুই মিত্র ওয়াশিংটন ও বেইজিং দখলদার জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই অর্থাৎ, ১৯৪৯ সালে মহাচীনে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট বিপ্লব হওয়ার পর প্রশান্তের দুই পারের বড় দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয়।

২০২১ সালের ২৫ জুলাই আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরা হয়।

গণচীনে গৃহযুদ্ধ ও কমিউনিস্ট বিপ্লব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দখলদার জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে চীনের জাতীয়তাবাদী ও কমিউনিস্টরা ঐক্যবব্ধ থাকলেও ১৯৪৫ সালে জাপানের আত্মসমর্পনের পর আবারও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে চীন। সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘চায়না হোয়াইট পেপার’ প্রকাশ করে।

এতে বলা হয়—চীনের গৃহযুদ্ধে ওয়াশিংটন দুই পক্ষ থেকেই দূরত্ব বজায় রাখবে। চীনের জাতীয়তাবাদীরা তাইওয়ান ও হাইনান দ্বীপে আশ্রয় নিলে ১৯৪৯ সালে মাও সেতুং দেশটির মূল ভূখণ্ডে কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থা জারি করেন।

মাওয়ের নির্দেশে মহাচীন নাম নেয় গণপ্রজাতন্ত্রী চীন বা গণচীন।

সেসময় মার্কিন কূটনীতিকরা চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সেতুংয়ের সঙ্গে দেখা করলেও তারা জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাই-সেকের সরকারকে চীনের আইনগত সরকার হিসেবে স্বীকৃতির পথ বেছে নেয়।

কোরিয়া যুদ্ধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তথা ১৯৫০ সালে কোরীয় উপদ্বীপ দুই অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন পাওয়া ‘পিপলস আর্মি’ ও অন্যটির নিয়ন্ত্রণ নেয় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ‘জাতিসংঘ বাহিনী’।

যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত জাতিসংঘের বাহিনী কোরিয়া উপদ্বীপের উত্তর অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীন সীমান্ত পর্যন্ত চলে এলে বেইজিং কোরিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

আধিপত্যের লড়াইয়ে বেশ কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যুর পর ১৯৫৩ সালে দুই পক্ষ যুদ্ধ বন্ধ করে কোরিয়ার দুই অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পোক্ত করে। বিবদমান পক্ষগুলো দুই দেশের সীমান্তে গড়ে তোলে ‘অসামরিক অঞ্চল’।

তবে সেই সময় থেকে উত্তর কোরিয়ায় চীন ও বর্তমানের রাশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির প্রভাব বজায় আছে।

তাইওয়ান সংকট

১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয় তারা তাইওয়ান প্রণালির দ্বন্দ্বে জড়াবে না। সে বছর মার্চে চীনের কমিউনিস্ট সরকার চীনা জাতীয়তাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা হাইনান দ্বীপ দখলের চেষ্টা করলে ও জুনে কোরিয়া যুদ্ধ শুরু হলে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যান তাইওয়ান প্রণালিকে ‘নিরপেক্ষ’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেন।

সেসময় ট্রুম্যান তাইওয়ান প্রণালিতে নৌবাহিনী পাঠান। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের জাতীয়তাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা তাইওয়ান দ্বীপটির নিরাপত্তা দিয়ে আসছে।

তাইওয়ানে আশ্রয় নেওয়া চীনা জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা চুক্তিও করে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিউনিস্ট চীনে পরমাণু বোমা ফেলার পরামর্শ বারবার ওয়াশিংটন ডিসিকে দেয়। এমন বাস্তবতায় চীনের কমিউনিস্ট ও জাতীয়তাবাদী নেতারা আলোচনায় বসতে বাধ্য হন।

১৯৫৮ সালে বেইজিং সরকার ‘বিদ্রোহী’ জাতীয়তাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলোয় আবার বোমা ফেলতে শুরু করলে তাইওয়ানে চীনের সম্ভাব্য ‘আগ্রাসন’ ঠেকাতে মার্কিন সরকার দ্বীপবাসীদের দিকে সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেয়। তখন চীনকে থামাতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পরমাণু হামলার বিষয়টি সামনে আসে।

শেষমেশ ১৯৭৯ সালে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক স্বাভাবিক করলে পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নেয়।

চীনের পরমাণু বোমা অর্জন ও পরিবর্তিত বাস্তবতা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রমাগত পরমাণু হামলার হুমকি পাওয়া চীন পরমাণুশক্তি হাতে পেতে মরিয়া হয়ে উঠে। ১৯৫০ এর দশকে চীন প্রতিবেশী তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে।

কিন্তু, সোভিয়েত নেতা নিতিকা ক্রুশচেভ পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে রাজি হয়ে যাওয়ায় চীনকে পরমাণুশক্তি অর্জনে ‘একলা চলো’ নীতি নিতে হয়।

১৯৬৪ সালের অক্টোবরে চীন প্রথম পরমাণু বোমা এবং এর ৩ বছর পর দেশটি সফলভাবে হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালায়।

বলা বাহুল্য, এরপর বিশ্বমঞ্চে চীনের অবস্থান অনেকটাই পাল্টে যায়। চীন হয়ে উঠে নতুন পরাশক্তি।

‘পিংপং কূটনীতি’

ইতিহাস-খ্যাত ‘পিংপং কূটনীতি’ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব আমেরিকান ডিপ্লোম্যাসি-র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—১৯৭১ সালে জাপানের নাগোয়ায় বিশ্ব টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে যোগ দিতে গিয়েছিল মার্কিন দল।

সেসময় মার্কিন খেলোয়াড় গ্লিন কোয়ান ও চীনা খেলোয়াড় ঝুয়াং ঝেডংয়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

গ্লিন কোয়ান তাদের জন্য নির্দিষ্ট বাস ধরতে না পেরে চীনা দলের বাসে উঠেছিলেন। চীনা দলের ঝুয়াং ঝেডং সেই মার্কিন খেলোয়াড়ের কাছে এসে করমর্দন করেন। তিনি মার্কিন খেলোয়াড়কে হুয়াংশান পর্বতের ছবি আঁকা এক টুকরো রেশম কাপড় উপহার দেন।

তারা বাস থেকে নামলে সাংবাদিকরা তাদের যুগলবন্দি ছবি তোলেন।

এর দুইদিন পর তৎকালীন পিকিং বা বর্তমানের বেইজিং সরকার মার্কিন দলকে চীনে খেলতে আমন্ত্রণ জানায়। যুক্তরাষ্ট্র সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং দ্রুত ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়।

সে সময় খেলোয়াড়দের পাসপোর্টে কোনো কমিউনিস্ট-শাসিত দেশে বা অঞ্চল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সেই নিষেধাজ্ঞা-সম্বলিত বাক্যটি কালো কালি দিয়ে ঢেকে দেন।

সে বছর ১০ এপ্রিল জাপান থেকে মার্কিন খেলোয়াড়রা হংকং হয়ে চীনে ঢোকেন। তারা বেইজিং, সাংহাই ও তিয়ানজিন সফর করেন। চীনা খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে গ্রুপ ছবি তোলেন।

এমনকি, চীনের প্রধানমন্ত্রী ঝোউ এনলাই মার্কিন খেলোয়াড়দের অভ্যর্থনা জানান। বেইজিং সরকার চীনা খেলোয়াড়দের সঙ্গে মার্কিন খেলোয়াড়দের প্রীতি ম্যাচের পাশাপাশি ভোজ, বিনোদন ও পর্যটনের ব্যবস্থা করে।

ইতিহাসে সাড়া জাগানো এই ঘটনা ‘পিংপং’ কূটনীতি হিসেবে খ্যাত।

তবে এরও একটি প্রেক্ষাপট আছে। সমাজতন্ত্রের ধরন নিয়ে প্রতিবেশী সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চীনের আদর্শিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ ছাড়াও, ১৯৬৯ সালে দেশ দুটির মধ্যে সীমান্ত সংঘাত লেগে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে চীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৭১ সালে মার্কিন টেবিল টেনিস খেলোয়াড়দের চীনে আমন্ত্রণ জানায়। সে বছরই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মিত্র পাকিস্তানের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে চীন সফর করেন।

এর পরের বছর মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন ঐতিহাসিক সফরে চীনে যান। তিনি চীনের নেতা মাও সে তুংয়ের সঙ্গে দেখা করেন। এই দুই নেতা সোভিয়েত ইউনিয়নকে তাদের উভয়ের ‘শত্রু’ হিসেবে আখ্যা দেন।

চেয়ারম্যান মাও ও রাষ্ট্রপতি নিক্সন দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা উদ্যোগ নেন। তাইওয়ানসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানের রাস্তা বের করতে রাজি হন।

যুক্তরাষ্ট্রের এক চীন-নীতি ও তাইওয়ান আইন

১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কে আবারও একটি ইতিবাচক মোড় আসে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ছিলেন জিমি কার্টার। চীনের শীর্ষ ক্ষমতায় ছিলেন সংস্কারপন্থি নেতা ডেং শিয়াওপিং।

১৯৭৬ সালে মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর শিয়াওপিং চীনের নেতৃত্বে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতা পায়।

সেসময় যুক্তরাষ্ট্রও ‘এক চীন নীতি’ গ্রহণ করে এবং তাইপের পরিবর্তে বেইজিংকে চীনের শাসনকেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

একইসঙ্গে, মার্কিন কংগ্রেসে ‘তাইওয়ান সম্পর্ক আইন’ পাস হয়। তখন দাতব্য প্রতিষ্ঠান আমেরিকান ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানের সঙ্গে বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য সম্পর্ক বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

তিয়েনআনমেন স্কয়ারে হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী দশক

সারা দুনিয়ায় সাড়া জাগানো চীনের শাসকবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক হয়ে আছে তিয়েনআনমেন স্কয়ার। ১৯৮৯ সালে হাজারো শিক্ষার্থী দেশটির কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তনের ডাক দিয়ে বেইজিংয়ের সেই ঐতিহাসিক এলাকায় সমবেত হন।

কিন্তু, ক্ষমতাসীনরা সেই অহিংস আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করে। সামরিক ট্যাংকের সামনে এক নিরস্ত্র যুবকের দাঁড়িয়ে থাকার আলোকচিত্রটি আজো পৃথিবীতে জবরদস্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে আছে।

তিয়েনআনমেন স্কয়ার হত্যাকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা নিয়ে লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়—চীন সরকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘৩ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন। মারা গেছেন ২০০-র বেশি। নিহতের মধ্যে ৩৬ জন কলেজ শিক্ষার্থী ও কয়েক ডজন সেনা সদস্য।’

সংস্থাটি আরও জানায়—তবে প্রকৃত সংখ্যা অজানা।

ঘটনার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯০ সালের ৪ জুন টাইম ম্যাগাজিনের ‘ঠিক কতজন মারা গেলেন?’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে চীনা রেডক্রসের বরাত দিয়ে বলা হয়—২ হাজার ৬০০ মানুষ মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ১০ হাজার মানুষ।

২০১৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিবিসি জানায়—তিয়েনআনমেন স্কয়ারে প্রতিবাদে মৃতের সংখ্যা ছিল ‘১০ হাজার’।

একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সেনাবাহিনী দিয়ে সহিংসভাবে দমন করায় চীন সমস্ত দুনিয়ার কাছে নিপীড়ক রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হতে থাকে। সেসময় মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ সিনিয়র চীনে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত রাখেন।

এ ঘটনার ১০ বছর পর অর্থাৎ ১৯৯৯ সালে দক্ষিণপূর্ব ইউরোপে কসোভোর স্বাধীনতা আন্দোলন দমনে সেনা পাঠায় সার্বিয়া। কসোভোয় সার্বিয়ার হামলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে বোমা ফেলে ন্যাটো বাহিনী।

সেসময় মার্কিন যুদ্ধবিমানের বোমায় বিধ্বস্ত হয় বেলগ্রেডের চীনা দূতাবাস। এ ঘটনায় ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমা চায়। তবে এর প্রতিবাদ হিসেবে বেইজিংয়ে মার্কিন দূতাবাসে পাথর ছোঁড়ে বিক্ষোভকারীরা। সেখানে মার্কিন কর্মকর্তাদের ৩ দিন আটকে রাখা হয়।

পরিণতিতে, চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকে।

চীন যখন বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ অর্থনীতি

২০১০ সালে চীন প্রতিবেশী জাপানকে টপকে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ অর্থনীতির দেশ হয়। সারাবিশ্বে চীনকে দেখা যায় এক নতুন ভূমিকায়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় রপ্তানি ও আমদানিকারক দেশ হিসেবে সারা দুনিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে শুরু করে বেইজিং। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় কম দামের চীনা পণ্যে বাজার ছেয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে শুরু করে।

এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের প্রভাব কমাতে নানান উদ্যোগের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

তবে ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় আসা বারাক ওবামা ২০১৩ সালে চীনের ক্ষমতায় আসা শি জিনপিংকে নিয়ে ‘মাও-নিক্সন’ যুগের সাফল্যে ফিরে যাওয়ার ডাক দেন।

কিন্তু, উত্তর কোরিয়া, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, সাইবার নিরাপত্তা ও তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির মতো প্রসঙ্গ নিয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য কমানো যায়নি।

২০১৫ সালে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একতরফা ‘সামরিকীকরণ’ নিয়ে নতুন করে দ্বন্দ্বে জড়ায় ওয়াশিংটন ও বেইজিং।

এই সাগরের ওপর দাবি নিয়ে চীনের সঙ্গে প্রতিবেশী ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, ফিলিপাইন ও স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানের দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমের দেশগুলো চীন-বিরোধিতার পথ বেছে নেয়।

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ

২০১৭ সালে ক্ষমতায় এসে এর পরের বছর মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ববাণিজ্যে পরাক্রমশালী হয়ে ওঠা চীনের বিরুদ্ধে ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। তিনি চীনা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। তিনি চীনা প্রযুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ দুনিয়াজুড়ে চীনের প্রভাব কমাতে নানা ধরনের ব্যবস্থা নেন।

বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হংকংয়ে চীন-বিরোধী গণবিক্ষোভ কঠোরভাবে দমনের অভিযোগ তোলে ওয়াশিংটন। সেই অভিযোগকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করে চীন সরকার। আবারও শুরু হয় ‘চাপান উতোর’।

২০২০ সালে গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে হিউস্টনে চীনা কনসুলেট বন্ধের নির্দেশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিশোধ হিসেবে চেংদুতে মার্কিন কনসুলেট বন্ধ করে গণচীন।

এমন সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ায় রিচার্ড নিক্সন প্রেসিডেন্টশিয়াল লাইব্রেরিতে এক বক্তব্যে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘চীনের সঙ্গে ৫০ বছরের সম্পর্কে মার্কিন জনগণ আসলে কী দেখতে পেল?’ তিনি চীনের রাষ্ট্রপতিকে ‘একদলীয়’ ভাবনা থেকে বের হয়ে আসার পরামর্শও দেন।

সেদিন রিচার্ড নিক্সনের এক মন্তব্য তুলে ধরে বক্তব্য শেষ করেছিলেন পম্পেও। নিক্সন বলেছিলেন, ‘যতক্ষণ না চীন বদলাচ্ছে ততক্ষণ পৃথিবী নিরাপদ নয়’।

২০২১ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা জিনজিয়াং প্রদেশে আদি বাসিন্দা উইঘুরদের ওপর জাতিগত নিধনের অভিযোগ তোলেন চীনা সরকারের বিরুদ্ধে। ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ দিন পম্পেও বলেছিলেন, ‘জিনজিয়াংয়ে মুসলিম উইঘুর ও অন্যান্য ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী কাজ করে যাচ্ছে চীন।’

পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেওয়ের মতো একই কথা বলেন এবং বাইডেন প্রশাসন পূর্ববর্তী ট্রাম্প প্রশাসনের মতো চীনের বিরুদ্ধে নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা জারি রাখেন।

শির হোয়াইট হাউস সফর ও পরিবর্তিত বাস্তবতা

গত ২৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে এক প্রতিবেদনে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের ঐতিহাসিক সফরের গুরুত্ব ও পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়গুলো তুলে ধরে হয়।

এতে বলা হয়—সারাবিশ্বে বাণিজ্যের পরিবেশ বাড়াতে ও শান্তি-সমৃদ্ধি বজায় রাখতে রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং আলোচনা করেছেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায্যতার ওপর ভিত্তি করে কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য দুই দেশ গঠনমূলক সম্পর্ক তৈরিতে রাজি হয়েছে, বলেও এতে জানানো হয়।

প্রতিবেদনে অনুসারে, পৃথিবীটা মার্কিনিদের জন্য আরও নিরাপদ রাখতে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প রাশিয়া ও চীনকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন।

দুই পক্ষই রাজি হয়েছেন যে ইরানকে কোনোভাবেই পরমাণু বোমা অর্জন করতে দেওয়া হবে না।

যুক্তরাষ্ট্র যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চীনের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে, সে কথাও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

একইদিনে, নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনের শিরোনামে জানায়—‘ওয়াশিংটন ছাড়ার সময়ও শি-কে ঘিরে মতপার্থক্যের রেশ ভেতরে ভেতরে রয়েই গেছে।’

চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে শি জিনপিংয়ের রাষ্ট্রীয় সফর বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও জমকালোভাবে শেষ হলেও আশ্চর্যজনকভাবে এই দুই দেশের মতবিরোধ আছে যেসব বিষয়ে, কেন যেন সেগুলো নিয়ে কোনো আলোচনাই হলো না।

প্রতিবেদন অনুসারে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ ও ইরান যুদ্ধ বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলেও এসব নিয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি।

এতে আরও বলা হয়, ভক্ত-সমর্থকরা মনে করেন যে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্কই হচ্ছে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের চাবিকাঠি।

যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও বাইডেন প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের চীনবিষয়ক সাবেক পরিচালক জুলিয়ান গেউইরৎজের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের চ্যালেঞ্জগুলো শি-র সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কানাগলিতে ঢুকে পড়েছে।

তার মতে, ট্রাম্প হয়ত বেইজিংয়ের কৌশল সম্পর্কে অবগত বা উদ্বিগ্ন নন।

চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শি তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতার করতে ট্রাম্পের ওপর চাপ দিয়েছেন।

নিউইয়র্কের কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালেন আর কার্লসন সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘তাইওয়ান নিয়ে ট্রাম্পের নীরবতাকে মার্কিনিদের একাংশ বিজয় হিসেবে দেখতে পারেন। বাস্তবতা হচ্ছে, বল এখন চীনের কোর্টে।’

প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়, আটলান্টা চিড়িয়াখানায় পান্ডা পাঠানোর সিদ্ধান্ত ও চীনে মার্কিন শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগ দিয়ে শি মূলত ‘সাংস্কৃতিক প্রভাব’ (সফট পাওয়ার) বিস্তারেই বেশি মনোযোগী। তবে তা অনেক পুরোনো কৌশল।

আবার ফিরে আসা যাক ‘থুসিদিদিস ফাঁদ’ শব্দগুচ্ছে। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং বলেছেন—‘আমাদের উচিত শান্তির মধ্যে সহাবস্থান করা। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—দুটোই বড় দেশ। সহযোগিতার মাধ্যমে ভালোকিছু অর্জন করতে হবে। সংঘাতে জড়ালে তা হারাতে হবে। দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে আলোচনা দরকার। সংকট মোকাবিলার কৌশল বের করতে হবে।’

শি মনে করেন, ‘থুসিদিদিস ফাঁদ’ থেকে দূরে সরে আসতে হবে। অর্থাৎ, উদীয়মান রাষ্ট্রশক্তিকে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রশক্তির ওপর আধিপত্য বিস্তারের ইচ্ছা দূর করতে হবে।

দ্য গার্ডিয়ান জানাচ্ছে—গত মে মাসে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময় শি এই কথাটি মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে বলেছিলেন। কীভাবে সংঘাত এড়ানো যায় সেই বার্তাও তিনি দিয়েছিলেন।

এদিকে, গত ২৫ সেপ্টেম্বর দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানায়—শি-কে বন্ধু হিসেবে জড়িয়ে ধরলেন ট্রাম্প, এখন দেখার বিষয় চীন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা পাল্টায়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের চায়না প্রোগ্রাম-এর পরিচালক ইয়ান সান সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘ট্রাম্প যা করেছেন তা অভূতপূর্ব। তিনি শি-কে তার বন্ধু ও চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।’

তার ভাষ্য: ‘সমালোচকরা হয়ত বলবেন যে কীসের বিনিময়ে এমনটি হলো? আমরা চীনকে আমাদের ঘরে আসতে অনুমতি দিয়েছি। আমরাই চীনকে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছি। মার্কিন শ্রেষ্ঠত্বে ধস নামার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’

একই দিনে চীনের সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এক প্রতিবেদন জানায়—ট্রাম্প ও শি নৈশভোজ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

সেই ভোজে ট্রাম্প মেহমান শি-কে যেভাবে খাতির করেছেন তা ১৯৭১ সালের ‘পিং পং’ কূটনীতির স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়।

শুধু তাই নয়, ট্রাম্প ১৫৮ বছর আগে মার্কিন মুলুকে প্রথম চীনা কূটনীতিকের আগমনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতাও তুলে ধরেছেন।

এত কিছুর পরও প্রশ্ন থেকে যায়—যে চীনে একসময় পরমাণু বোমা ফেলার হুমকি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, পরে সেই চীনের দিকে বিভিন্ন সময় বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েও ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করতে দ্বিধা করেনি ওয়াশিংটন। সেই ডিসির ওপর বেইজিং ঠিক কতটা বিশ্বাস রাখতে পারে?

 

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ