
বাগেরহাট প্রতিনিধি: ক্ষীণ ও জড়ানো কণ্ঠে কনের বাবা আবদুস সালাম বলছিলেন, ‘গাড়িতে আমার দুই মেয়ে ছিল, আমার জামাই ছিল…আমার বড় মেয়েটার বুধবার বিয়ে হয়েছে। ওর নাম মার্জিয়া…আর ছোটটার নাম…।’ কথা শেষ করতে পারছিলেন না তিনি। একটু থেমে মাথা নেড়ে আবার বললেন, ‘ছোট মেয়েটার নাম লামিয়া।’
বুধবার রাতে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) বিয়ে হয়। তার শ্বশুরবাড়ি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেলাবুনিয়ায়।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বরপক্ষ মাইক্রোবাসে করে নববধূকে নিয়ে মোংলার উদ্দেশে রওনা হয়। বিকেলে দুর্ঘটনার খবর পান আবদুস সালাম। চারটার দিকে রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় খুলনা-মোংলা মহাসড়কে ওই মাইক্রোবাসের সঙ্গে নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের আরোহী বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হয়েছেন।
বিয়ের অনুষ্ঠান ও অন্যান্য আচার শেষে নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিকেলে খুলনার কয়রা থেকে তারা মাইক্রোবাসে রওনা হন বাগেরহাটের মোংলার উদ্দেশে।
সাব্বির ও মিতুর পরিবারের বেশ কয়েকজন ছিলেন ওই মাইক্রোবাসে। কিন্তু এ যাত্রা শেষ হয়ে যায় মোংলার শেলাবুনিয়া গ্রামে সাব্বিরের বাড়ির মাত্র ১৩ কিলোমিটার আগে।
বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের বেলাই ব্রিজের কাছে একটি বাসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় মিতু-সাব্বির ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বহনকারী প্রাইভেটকারটির।
পুরো পরিবারের সারাদিনের উৎসবের আনন্দ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় মুহূর্তেই। নবদম্পতি ও তাদের স্বজনদের নিথর দেহ পড়ে থাকে মহাসড়কে।
নিমিষেই দুটি পরিবারের আনন্দ দখল করে নিল স্তব্ধতা আর শোক।
কাটাখালী হাইওয়ে থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) কে এম হাসানুজ্জামান জানান, নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
কাটাখালী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাফর আহমেদও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে থানার ওসি জাফর আহমেদ মুঠোফোনে বলেন, মাইক্রোবাসটিতে চালকসহ ১৫ জন ছিলেন। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় ১৪ জন মারা গেছেন। আর একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মেহনাজ মোশাররফ জানান, হাসপাতালের মর্গে ৯টি মরদেহ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নৌবাহিনীর একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ৭টি মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়। এছাড়া অন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ৩ জনকে আহত অবস্থায় আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে দুজন পরে মারা যান এবং অন্য একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’
রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুকান্ত কুমার পাল জানান, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজনের মরদেহ রাখা হয়েছে।’
রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত নিহতদের সবার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় জানা যায়নি।
তবে খুলনা মেডিকেল কলেজের রেজিস্ট্রারে ৯ জনের নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে।
তারা হলেন—আসাদুর রহমান সাব্বির (২৭), মিতু (২০), পুতুল (৩০), ঐশী (৩০), আলিফ (১২), মো. নাঈম শেখ (২৮), এক বছর বয়সী ফাহিম, দেড় বছর বয়সী ইরাম ও আনোয়ার বেগম (৪৮)।
মোংলা পৌরসভা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খোরশেদ আলম জানান, সাব্বিরের বাবা আব্দুর রাজ্জাকও এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। রাজ্জাক মোংলা পৌরসভা ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন।











